নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে লক্ষ্য আকাশছোঁয়া, বাস্তবায়নযোগ্য কতটা
২০৩০ সালের মধ্যে দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে তিন হাজার ৭শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ১০ বছরের প্রচেষ্টায় বর্তমানে দেশে মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৭শ ৪৩ মেগাওয়াট। এটাকে পাঁচ বছরে দ্বিগুণের বেশিতে নিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এ লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জমির সংকট, উচ্চ শুল্ক-কর, বিনিয়োগ জটিলতা, সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রথমবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় ২০১৭ সালে। ওই বছর জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে স্থাপিত ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। এটি ছিল দেশের প্রথম গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এখন সক্ষমতা ১৪শ মেগাওয়াটের কিছুটা বেশি। এটা ২০৩০ সালে ৩৭শ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া অবাস্তব। এগুলো বাস্তবধর্মী প্ল্যান হিসেবে করা যায়। কিন্তু সরকার মনে করে যত প্রকল্প বাড়বে তাতে সরকারে প্রচারণা হিসেবে বেশি কাজে দেবে। সে কারণেই এরকম সংখ্যা আসে। এগুলো আসলে বাস্তবধর্মী নয়।-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম
তবে এর আগে জলবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত ছিল। ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ ১৯৬০ এর দশক থেকেই জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ মিলিয়ে অন গ্রিড উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট এবং অফ গ্রিড উৎপাদন ক্ষমতা ৩৭৪ দশমিক ৫২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৭৪৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৭ সালের দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ২০৯ দশমিক ৮৮ মেগাওয়াট, ২০১৮ সালে ২৮৪ মেগাওয়াট, ২০১৯ সালে ৩৫২ দশমিক ১১ মেগাওয়াট, ২০২০ সালে ৪১৬ দশমিক ২২ মেগাওয়াট, ২০২১ সালে ৫৩২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট, ২০২২ সালে ৬৫৬ দশমিক ৬৮ মেগাওয়াট, ২০২৩ সালে ৯৬৬ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট, ২০২৪ সালে ১১৫৩ দশমিক ৯৩ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালে ১৩৯৬ দশমিক ৩৪ মেগাওয়াট এবং ২০২৬ সালে (মে মাস পর্যন্ত) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৪৫০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট।
স্রেডার তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৭ সালে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল ৪০৪ মেগাওয়াট, ২০১৮ সালে ৫১৮ মেগাওয়াট, ২০১৯ সালে ৫৮৬ দশমিক ০৪ মেগাওয়াট, ২০২০ সালে ৬৫০ দশমিক ১৫ মেগাওয়াট, ২০২১ সালে ৭৬৬ দশমিক ৪৯ মেগাওয়াট, ২০২২ সালে ৮৯০ দশমিক ৬৭ মেগাওয়াট, ২০২৩ সালে ১২০০ দশমিক ৭৮ মেগাওয়াট, ২০২৪ সালে ১৪৪৭ দশমিক ৯২ মেগাওয়াট, ২০২৫ সালে ১৬৮৯ দশমিক ৪৩ মেগাওয়াট, ২০২৬ সালে (মে মাস পর্যন্ত) মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১৭৪৩ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াট।
সবমিলিয়ে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অতিরিক্ত এত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
দিনশেষে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেই যেতে হবে। এছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। পুরো বিশ্বই এখন এদিকে হাঁটছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান অভাবনীয় উন্নতি করেছে এ সেক্টরে। সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।-জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও করহার বিনিয়োগে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্য সরঞ্জামে ২৫ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত টোটাল ট্যাক্স ইনসিডেন্স (টিটিআই) থাকায় প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) জটিলতা এবং উপযুক্ত জমির অভাবেও অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

বিএনপি সরকার গঠনের পরই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) কাছে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হয়। স্রেডার পাঠানো কর্মপরিকল্পনার একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে।
আরও পড়ুন
সৌর বিদ্যুৎ: সম্ভাবনার আলো এবং জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথরেখা
৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার
১০ হাজার ৬১২ কোটি টাকা খরচে তিন জেলায় হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র
জ্বালানি সংকটে পথ দেখাচ্ছে চীন, তিব্বতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপ্লব
এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৭শ ৫০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২১শ মেগাওয়াট, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ২৭শ মেগাওয়াট এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৩৭শ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লক্ষ্য অর্জনে শুধু নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না, বরং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর-শুল্ক কমানো, সহজ অর্থায়ন, আধুনিক গ্রিড অবকাঠামো তৈরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। অন্যথায় ২০৩০ সালের মধ্যে তিন হাজার ৭শ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন সক্ষমতা ১৪শ মেগাওয়াটের কিছুটা বেশি। এটা ২০৩০ সালে ৩৭শ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়া অবাস্তব।’
সরকারের এরকম উচ্চাভিলাসী প্ল্যান সব সময় থাকে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো বাস্তবধর্মী প্ল্যান হিসেবে করা যায়। কিন্তু সরকার মনে করে যত প্রকল্প বাড়বে তাতে সরকারে প্রচারণা হিসেবে বেশি কাজে দেবে। সে কারণেই এরকম সংখ্যা আসে। এগুলো আসলে বাস্তবধর্মী নয়।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিনশেষে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেই যেতে হবে। এছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। পুরো বিশ্বই এখন এদিকে হাঁটছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান অভাবনীয় উন্নতি করেছে এ সেক্টরে। সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে।’
বিগত সরকারও নানান পরিকল্পনা করেছে কিন্তু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার উদ্যোগ নিয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৭শ মেগাওয়াট নবায়যোগ্যতে নিয়ে যাবে। আবার মন্ত্রী বলেন, ১০ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে যাবেন। সরকার আসলে বলার জন্য অনেক কথাই বলে। বাস্তবে কতটা উদ্যোগ নেবে তার ওপর নির্ভর করবে এই পরিকল্পনা সাকসেস হবে কি না।’
এই পরিকল্পনা সফল করা বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় জানিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘তবে সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলে এই সেক্টর এগিয়ে যাবে।’
এনএস/এএসএ/এমএফএ