১৪ বছর ধরে ভিকারুননিসার ড্রেসের টেন্ডার পান ইব্রাহিম

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫১ পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
প্রতিষ্ঠানটির বেইলি রোড শাখার নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার পর তার সহপাঠীদের বিক্ষোভ। এরপর আলোচনায় আসে ভিকারুননিসা, উঠে আসছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি

নামি-দামি প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ঢাকায় প্রতিষ্ঠানটির চারটি শাখা। প্রধান শাখা রাজধানীর বেইলি রোডে। বাকি তিনটি ধানমন্ডি, আজিমপুর ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। চারটিতে মোট ছাত্রী ২৫ হাজার। এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রীর জন্য ড্রেসকোড নির্ধারণ করে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এক ব্যক্তি প্রত্যেক ছাত্রীকে পোশাক সরবরাহ করেন। এ জন্য প্রতি ছাত্রীর ড্রেসের জন্য নেয়া হয় দুই হাজার টাকা।

অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রীদের কাজ থেকে এত টাকা নেয়া হলেও পোশাক দেয়া হয় নিম্নমানের। গত ১৪ বছর ধরে ইব্রাহিম মোল্লা নামের এক ব্যক্তিই এই পোশাক তৈরির টেন্ডার পাচ্ছেন। টেন্ডার পেতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের উৎকোচও দিয়ে থাকেন। বাগিয়ে নেন টেন্ডার।

সূত্র জানায়, পোশাকের জন্য দুই বছর পর পর টেন্ডার দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির চারটি শাখায় ২৫ হাজার ছাত্রীর কাছ থেকে প্রতিবার ড্রেস বিক্রিবাবদ ইব্রাহিম মোল্লা পাঁচ কোটি টাকা আয় করেন। এর মধ্যে পোশাক বানানো বাবদ এক কোটি টাকাও তার খরচ হয় না।

অভিভাবকরা বলছেন, ইব্রাহিম মোল্লা একেক জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এক সেট ড্রেসবাবদ দুই হাজার টাকা নেন। কিন্তু বাইরে এই ড্রেস বানালে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খচর হতো।

জানা গেছে, এই ইব্রাহিম মোল্লার বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি ২০০৪ সাল থেকে পোশাক সরবরাহ করছেন।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক এক অভিভাবক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইব্রাহিম মোল্লা নিজে চার-পাঁচজনকে দিয়ে টেন্ডার ড্রপ করান, যাতে ঘুরে-ফিরে তিনিই টেন্ডার পান। আর উৎকোচ নিয়ে এই কাজে সহযোগিতা করেন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।

এক ছাত্রীর বাবা ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন জানান, ‘ভিকারুননিসায় ড্রেস বিক্রি করে প্রতিবার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ইব্রাহিম মোল্লা। বছরের পর বছর স্কুলটির ড্রেস বানানোর টেন্ডার নিয়ে বাণিজ্য করছেন তিনি।

দিলশাদ জাহান নামে একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানান, ‘ভিকারুননিসার ড্রেসটা এতই খারাপ মানের যে এটা পরলেই শরীর গরম হয়ে যায়। অস্বস্তি লাগে। অনেকবার ম্যাডামদের এটা বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। একই ড্রেস চলছে বছরের পর বছর।’

শায়লা রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘সবচেয়ে নিম্নমানের ড্রেস দেয় ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। বারবার এটা নিয়ে কথা বললেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ইব্রাহিম নামে এক লোক স্কুলটাকে জিম্মি করে ফেলেছে। তিনি যতদিন আছেন এই ড্রেসের মান আর ভালো হবে না।’

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরিন আক্তারের মা সুমি বেগম জানান, ‘আমার মেয়ে চর্মরোগে ভুগেছে বেশ কয়েকদিন। ডাক্তার জানিয়েছেন, তার স্কুলড্রেস স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সারাদিন এই নিম্নমানের ড্রেসে থাকার কারণে তার শরীরে ফোসকা পড়ে গেছে।’

পোশাকের মান ভালো করার উদ্যোগ ভেস্তে গেছে

জানা গেছে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ স্কুলটির দায়িত্ব নেয় ২০১৭ সালে। নির্বাচিত এই পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেয়ার পর একজন সদস্য ছাত্রীদের ড্রেসের মান ভালো করার উদ্যোগ নেন।

তিনি প্রস্তাব দেন, বর্তমানে যে ড্রেস দেয়া হচ্ছে এর চেয়েও কম টাকায় সুতি কাপড়ের ড্রেস দেয়া যাবে, যা উন্নতমানের। ছাত্রীরা পরেও আরাম পাবে। তিনি বেশকিছু ড্রেস নিজের টাকায় বানিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দেখান। সেটি ছাত্রীরা বেশ ভালোভাবে গ্রহণও করেছিল। দাম ধরেছিলেন এক হাজার ২০০ টাকা।

তিনি বলেছিলেন, ড্রেসটা সাপ্লাইয়ের জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাউকে দেয়া হবে। তবে তিনি এটা তত্ত্বাবধায়ন করবেন, যাতে কেউ এখানে দুর্নীতি না করতে পারে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তার প্রস্তাব আমলে নেয়া হয়নি।

পরে পরিচালনা পর্ষদকে ‘ম্যানেজ’ করে ওই ইব্রাহিম মোল্লাই এটির কাজ বাগিয়ে নেন।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য বলেন, ‘ড্রেস নিয়ে ব্যাপক অরাজকতা হচ্ছে। বর্তমানে যে ড্রেস দেয়া হয় তা ব্যবহার উপযোগী নয়। আমি চেয়েছিলাম যেন ছাত্রীরা ভালো ড্রেস পরতে পারে। কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান গোলাম আশরাফ তালুকদার দাবি করেছেন, তারা সব কাজ আইনের ভেতরে থেকেই করছেন।

দীর্ঘদিনের টেন্ডার বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। অনিয়মের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে সেটির প্রমাণ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আপনি যে বিষয়ে (নিম্নমানের পোশাক) বলেছেন সে বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ আমি পাইনি।

এমএইচএম/জেডএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :