নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস: গ্রেফতার আতঙ্কে মাউশির কর্মকর্তারা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৩ পিএম, ১৮ মে ২০২২
প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অভিযোগে গ্রেফতার সুমন জোয়াদ্দার/ ছবি সংগৃহীত

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) জনবল নিয়োগের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাউশির অধীনস্থ পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এরই মধ্যে আটক করেছে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট (ডিবি)।

আটকরা ছাড়াও আরও ছয় থেকে সাতজন এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাই এ সিন্ডিকেটের কাছাকাছি থাকা অনেকেই এখন গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন। এ কারণে মাউশিতে এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

মাউশি থেকে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মাউশির অফিস ও স্কুল-কলেজে দেশব্যাপী ২৪টি পদে চার হাজার ৩২ জনকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। চারটি ধাপে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা ঠিকঠাক হলেও পঞ্চম ধাপের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।

এরপর রাজধানীর একাধিক পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রার্থীর কাছে উত্তর সরবরাহ করার প্রমাণ পায় ডিবি পুলিশ। এর সূত্র ধরে মাউশির অধীনস্থ দুজন কর্মকর্তা ও তিনজন কর্মচারীকে আটক করে ডিবি।

পুলিশ সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা সিন্ডিকেটে জড়িত আরও ছয় থেকে সাতজনের নাম বলেছে। তাদের মধ্যে মাউশির এক শিক্ষা কর্মকর্তাও আছেন। চ' আদ্যক্ষরের এই কর্মকর্তাই নাটের গুরু। ছাত্রলীগ আর শিক্ষামন্ত্রীর নাম বিক্রি করে চলা এই কর্মকর্তার নির্দেশেই পটুয়াখালী সরকারি কলেজের আরেক ক্যাডার শিক্ষক রাশেদুল ইসলাম ও বরগুনার স্কুলশিক্ষক সাইফুল ইসলাম প্রশ্নপত্র সরবরাহের কাজ করেন।

এছাড়া আরও কয়েকজনের মাধ্যমে উল্লিখিত শিক্ষা কর্মকর্তা পরীক্ষার প্রার্থী খুঁজে বের করেন। মাউশির সিসিটিভির গত একমাসের ভিডিও ফুটেজ খুঁজলে তাদের পরিচয় পাওয়া যাবে। এই কর্মকর্তাই পরীক্ষা কমিটির পক্ষে ইডেন কলেজে প্রশ্নপত্র সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া গ্রেফতার কর্মচারী নওশাদ ছিলেন মোহাম্মদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রশ্ন বহনকারী টিমের সদস্য বলেও জানায় পুলিশ সূত্র।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই দুইজনের মধ্যে কে প্যাকেট খুলে প্রশ্নফাঁস করেছে? এরই মধ্যে মাউশির উল্লিখিত শিক্ষা কর্মকর্তা গা ঢাকা দিয়েছেন। তাকে গ্রেফতার করতে পারলে আরও বিশদ তথ্য মিলবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে ডিবির তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, আরও ছয় থেকে সাতজনের নাম পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এই মুহূর্তে প্রকাশ করা যাবে না। তবে তাদের নাম মাউশি মহাপরিচালককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ উল্লিখিত চ' আদ্যক্ষরের কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বলেন, তার বিরুদ্ধে এখন অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এতোদিন তার নামে কেউ কিছু বলেনি।

তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারদের মধ্যে কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। আর ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে।

মাউশির কর্মকর্তারা জানান, গত ১৩ মে শুক্রবার ৫১৩ জন অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষর পদে নিয়োগের জন্য ঢাকা মহানগরের ৬১ কেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এসব পদে নিয়োগের জন্য এক লাখ ৭৯ হাজার ২৯৪ জন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ পর ১২টি কেন্দ্রের কয়েকজন পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্নের উত্তর সরবরাহ করা হয়।

বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেনে গেলে উত্তর পাওয়া প্রার্থীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যমতে, পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত মাউশির দুজন কর্মকর্তা ও তিনজন কর্মচারীকে আটক করা হয়। তাদের আটকের পর বর্তমানে অনেকে গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

নিয়োগ কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, টানা ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীন কাটিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরে বিতরণ করেছি। সেখান থেকে কীভাবে প্রশ্নফাঁস হলো, সেটি আমরা বুঝতে পারছি না।

‘এসব কাজে আমরা যারা জড়িত ছিলাম, সবাই পরীক্ষা শেষে এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর বাইরে বের হয়েছি। সেখান থেকে কারও পক্ষে প্রশ্ন ফাঁস করা সম্ভব নয়। অথচ যাদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়েছে তাদের নামই উঠে আসছে।’

এ সময় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।

জানা গেছে, মাউশির নিয়োগ পরীক্ষার ষষ্ঠ ধাপে, আগামী ৩ জুন লিখিত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। পঞ্চম ধাপে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হওয়ায় এখন সেটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শেষ ধাপে হিসাব সহকারী পদে ১০৬টি পদের জন্য ৭৩ হাজারের বেশি প্রার্থী আবেদন করেন।

জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (প্রশাসন ও কলেজ) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বুধবার (১৮ মে) জাগো নিউজকে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি আমরা শুনেছি। এ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জড়িত থাকার সন্দেহে ডিবি আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তীসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু পঞ্চম ধাপের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে, তাই সেটি বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। এর সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমএইচএম/এমপি/আরএডি

 

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]