খালেদা জিয়া নিজেই খাবার তুলে দিলেন তাদের
কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন উপমহাদেশের স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়া। তার প্রয়াণে রাষ্ট্রীয় শোকের তৃতীয় দিন ছিল গতকাল। তাকে নিয়ে নানান স্মৃতিকথা ভাগাভাগি করছেন তার স্নেহধন্য ও গুণগ্রাহীরা। তাদের অন্যতম মাইলস ব্যান্ডের সদস্য হামিন আহমেদ। দলবল নিয়ে খালেদা জিয়ার অতিথি হয়েছিলেন তারা।
১৯৯৩-৯৪ সালে মাইলস ব্যান্ডকে সেনানিবাসের বাসায় আমন্ত্রণ করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৬, শহীদ মঈনুল রোডে প্রধানমন্ত্রীর বাসায় গান করার আমন্ত্রণ পেয়ে রোমাঞ্চিত ছিল দলটি। ঘটনার স্মৃতিচারণ করে গতকাল (২ জানুয়ারি) শুক্রবার হামিন আহমেদ ফেসবুকে ইংরেজিতে লিখেছেন, ‘আগে কখনো বলা হয়নি, আজ শেয়ার করছি।’
হামিন আহমেদ লিখেছেন, ‘তখন মাইলস মানে ছিল আমি নিজে, শাফিন, মানাম এবং সম্ভবত মাহবুব। আমরা ভীষণ রোমাঞ্চিত ও উৎসুক ছিলাম, আর ভীষণ নার্ভাসও। কারণ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আমাদের গান শুনবেন! তারেক রহমান এবং তার বন্ধুরাও সেখানে ছিলেন।
আমরা শফিক ভাইয়ের সঙ্গে ওই বাসায় যাই। সেদিনই প্রথমবার সামনে থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ভীষণ স্নেহ ও সৌজন্যভরে আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, আমরা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। তারেক রহমান ও তার বন্ধুরাও আমাদের খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করিয়েছিলেন।’
আরও পড়ুন:
খালেদা জিয়ার হাসির জন্যই প্রথম ভোট বিএনপিকে দিয়েছিলেন অভিনেতা
দিলরুবা খানের কাছে যে দুটি গান শুনতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া
তিনি লেখেন, ‘আমরা দুপুর প্রায় দুইটা-আড়াইটা পর্যন্ত সাউন্ড চেক করি, মাইলসের চিরাচরিত স্টাইলে। তখন লাঞ্চ টাইম হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই জিয়া পরিবারের বন্ধু-স্বজনরা আমাদের কাছাকাছি কোথাও নিয়ে খাইয়ে আনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ়ভাবে সবাইকে জানালেন, না, ওরা এখানেই খাবে, আমরা যা খাই তাই খাবে! এক কথায় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে গেলাম। আবারও অবাক হয়ে দেখি, তিনি নিজেই আমাদের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন! সেখানে বসে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এটা কি সত্যি?’
হামিন লেখেন, ‘সেদিনের ওই মুহূর্ত থেকে তার প্রতি আমার হৃদয়ে এক গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছিল। তিনি ছিলেন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, অত্যন্ত মর্যাদাবান, তবু কতটা মানবিক, কতটা সম্মান দেখাতে জানতেন! তিনি চাইলে এত কিছু না করলেও পারতেন, কিন্তু তিনি করেছিলেন। এ কারণেই তিনি আমাদের হৃদয়ে, মানুষের হৃদয়ে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে আছেন এবং থাকবেন।’
মাইলস ব্যান্ডের সদস্যরা
সংগীত পরিবেশনের স্মৃতিচারণ করে হামিন লিখেছেন, ‘সন্ধ্যায় আমরা যখন গান করি, তিনি বাগানের দিকে মুখ করা জালের ঘেরা অংশে বসে আমাদের গান শোনেন। পরে আমাদের গানগুলোর প্রশংসাও করেন। সেই দিনের গভীর প্রভাব আমার ও শাফিনের মনে আজীবনের জন্য রয়ে গেছে। সেই স্মৃতিই বছরের পর বছর আমাদের এবং আমাদের পরিবারের, আমার মায়েরও, মনে তার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জাগিয়ে রেখেছে।’
মা ফিরোজা বেগমের প্রয়াণের স্মৃতিচারণ করে হামিন লিখেছেন, ‘আমার মা ফিরোজা বেগম চিরবিদায় নিলেন। তিনি সারাজীবন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান লালন করেছেন এবং গানগুলোকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালের কথা, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ছাড়া কেউ শহীদ মিনারে আসেননি বা বাসায় এসে শ্রদ্ধা জানাননি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেবল মিডিয়ায় একটি বার্তা পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছিলেন। ফিরোজা বেগমের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা বা দাফন হয়নি।’
হামিন আহমেদ, ফিরোজা বেগম ও শাফিন আহমেদ
‘কিন্তু একজন মানুষ, অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও এক মুহূর্ত দেরি না করে আমার মায়ের কালিন্দীর বাসায় পৌঁছেছিলেন। তিনি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আমাদের সঙ্গে ঘরে বসেছিলেন, ফিরোজা বেগম ও তার স্মৃতির প্রতি অগাধ সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়েছিলেন, আর আমাদের এমনভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, যেন তিনি আমাদের আপনজন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ, মার্জিত ও হৃদয়বান মানুষ, যিনি আমার স্মৃতিতে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।’
ওই লেখায় হামিন যুক্ত করেন, ‘একটি আশ্চর্য কাকতালীয় ঘটনা হলো, বেগম খালেদা জিয়া তার জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন একটি বাড়িতে, যার নাম ছিল “ফিরোজা”।’ প্রায় ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে মাইলস ব্যান্ডের পথচলা। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বহু ঘটনার স্মৃতি বহন করে চলেছে দলটি ও তার সদস্যরা। এরই মধ্যে বিদায় নিয়েছেন দলের প্রধান ভোকাল ও গিটারিস্ট শাফিন আহমেদ।
এমএমএফ/আরএমডি