বর্ষা মৌসুমে তৈরি হচ্ছে মাছ ধরার জাল

সাজেদুর আবেদীন শান্ত
সাজেদুর আবেদীন শান্ত সাজেদুর আবেদীন শান্ত , ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ০৫:৪৯ পিএম, ২৩ জুন ২০২২

এখন আষাঢ় মাস, বর্ষাকাল। বাংলাদেশে সাধারণত এ সময় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। বৃষ্টির পানিতে নদী-নালা, খাল-বিল ভরে যায়। মাঝে মাঝে বন্যাও হয়ে থাকে। নদী, হাওর ও নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এ সময় প্লাবিত এলাকার নদী-নালা, খাল-বিলে নানা রকম দেশীয় মাছ পাওয়া যায়।

আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। মাছ ছাড়া আমাদের একবেলাও চলে না। বর্ষার সময়ে জেলেদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে শৌখিন মাছ শিকারী। বছরের অন্য সময়ে নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও বর্ষার এ সময়ে মানুষ অনেকটা অলস সময় পার করে। ঘরে বসে থেকে তাই শখ পূরণের জন্য ও পরিবারের মাছের চাহিদার কথা ভেবে মাছ ধরে। এ মাছ ধরতে জাল প্রয়োজনীয় উপাদান।

আবহমান গ্রামবাংলার মানুষ গ্রীষ্মের ধান মাড়াই শেষে অবসর সময়ে নানা রকম জাল বুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝাঁকি জাল, ধর্ম জাল ও ঠেলা জালসহ নানা রকমের জাল বোনেন তারা। তবে এসবের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ঝাঁকি বা তৌর জালই বেশি দেখা যায়। যদিও কেউ কেউ বাণিজ্যিক উদ্দেশে জাল বোনেন। অনেকে আবার শখ করে জাল বোনেন। এলাকা ঘুরে এমন জাল বোনার দৃশ্য চোখে পড়ে।

তেমনই এক দৃশ্য চোখে পড়লো বগুড়ার সোনাতলার গোবরচাপা বিলে। প্রাকৃতিক পরিবেশে আপনমনে জাল বুনে যাচ্ছেন একজন। তার পাশে বসে খোশগল্পে মেতে আছেন দু’জন প্রবীণ।

যিনি জাল বুনছেন, তার নাম শহিদুল ইসলাম অবো। বয়স ৫৫ বছর হবে। তিনি খুব নিপুণভাবে জাল বুনে চলেছেন। যে জালটি বুনছেন, তা কোথাও কোথাও ঝাঁকি জাল নামে পরিচিত। তবে স্থানীয় ভাষায় ‘তৌর জাল’ নামে পরিচিত। এ জাল বুনতে প্রয়োজন শক্ত নাইলনের সুতা, লোহার কাঠি ও রশি। এ জাল সাধারণত হাতে বোনা হয়। কারিগরের নিপুণ কৌশলে বোনা হয়। ঝাঁকি জাল বুনতে প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। একটি জাল বুনতে এক মাসও লেগে যায়। তবে একটানা কাজ করলে ১০-১২ দিনেই সম্ভব।

jagonews24

শহিদুল ইসলাম অবো জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এ জাল বোনা আমার দাদার কাছ থেকে শিখেছি। ছোটবেলায় দেখতাম, আমার দাদা কাটামারি (ধান মাড়াইয়ের কাজ) শেষ করার পর এই জাল বুনতেন। তখনই আমি তার কাছ থেকে এ জাল বোনা শিখি। এ জাল বোনা যেমন কঠিন; তেমন সহজও। একবার মনযোগ দিয়ে শিখলে তেমন কঠিন কাজ না।’

তিনি বলেন, ‘একটানা কাজ করলে জাল বুনতে আমার মাত্র সাত-আট দিন লাগে। জাল বোনার পরে জালে লোহার কাঠি লাগানো কঠিন কাজ। খুব ভালোভাবে গভীর মনযোগ দিয়ে কাঠি লাগাতে হয়। আমার জীবনে অনেক জাল তৈরি করেছি। তবে তা বেচার জন্য না। নিজের জন্য। অনেকে আবার চেয়েছেন, তাদের বানিয়েও দিয়েছি।’

ঝাঁকি জাল সাধারণত ছয় হাত থেকে আট হাত পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। সাধারণত মাঝারি আকারের একটি জালে তিন কেজি লোহার কাঠি ও আধা কেজি নাইলনের সুতা লাগে। আর বড় আকারের জাল বানাতে চার কেজি লোহার কাঠি ও এক কেজি সুতার প্রয়োজন হয়। আকার ও মানভেদে জালের দামেরও তারতম্য আছে। একেকটি জালের দাম সাধারণত ১ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

পাশে থাকা কামারপাড়া গ্রামের প্রবীণ দুদু প্রামাণিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখতাম এ গ্রামের ঘরে ঘরে তৌর ছিল। পুরুষ ম্যানষেরা গোবরচাপা বিলে তৌর দিয়া মাছ ধরতো। এখন আর দেখা যায় না। মাছই ধরতে চায় না কেউ। বাজার থেকে কিনে খায়। কেনা চাষের মাছ আর নিজের ধরা মাছ কি এক?’

এ কথা সত্য যে, আগের মতো আর এলাকায় এ ধরনের জাল তেমন বুনতে দেখা যায় না। এখন মেশিনের মাধ্যমে জাল বোনা হয়। তবে মেশিনের জাল ও হাতে তৈরি জালের পার্থক্য অনেক। হাতে তৈরি জাল নিখুঁত হয়ে থাকে। এ ছাড়া বেশ শক্ত ও টেকসই হয়। কালের পরিক্রমায় হাতে তৈরি জাল একসময় থাকবে না বলে মনে করেন প্রবীণরা।

এসইউ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]