বিজেপি কেন পুরো ভারতে একসঙ্গে নির্বাচন করাতে চায়?
বিজেপির অনেক দিনেরই লক্ষ্য, ভারতের লোকসভা নির্বাচন এবংর সব কয়টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন একই সঙ্গে করানো। তবে এবারই প্রথম সেই উদ্দেশ্যে সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ নিলো তারা। সম্প্রতি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন’ নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে কি না তা খতিয়ে দেখবে।
সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আপাতত শুধু কমিটি তৈরি হয়েছে। তারা গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেবে। তা নিয়ে বিতর্ক হবে সংসদে।
আরও পড়ুন>> ‘মোদী বনাম ইন্ডিয়া’: ভারতে ২৬ দলের নতুন জোট বিরোধীদের
তিনি বলেন, ভারতে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত একসঙ্গেই লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন হতো। এ নিয়ে আলোচনা তো হতেই পারে।
একসঙ্গে ভোট চান মোদী
কয়েক বছর ধরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও লোকসভা ও বিধানসভাগুলোর নির্বাচন একসঙ্গে করার কথা বলছেন। তিনি যে বছর প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেই ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিজেপি লিখেছিল, তারা সারা দেশে একসঙ্গে নির্বাচন করাতে চায়।
সাবেক রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি তৈরি করে সরকার এখন বোঝাতে চাইছে, বিষয়টা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুধু প্রধানমন্ত্রী মোদীই একাধিকবার বিষয়টি উত্থাপন করেছেন, তা নয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে রামনাথ কোভিন্দও এই ভাবনার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন।
আরও পড়ুন>> বিরোধীদের ২৬ দলের বিপরীতে মোদীর ৩৮ দলীয় জোট
ইতিহাস বলছে, লোকসভার ক্ষেত্রে সাতবার মেয়াদের আগেই সরকার পড়ে যাওয়ায় আগাম নির্বাচন দিতে হয়েছে। আর বিধানসভাগুলোর হিসাব মেলালে দেখা যাবে, ১০০র বেশিবার রাজ্য সরকারগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়েছে।

কোন প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে ভোট?
বর্তমানে রাজ্য বিধানসভা এবং লোকসভার পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হয়ে থাকে। যদি কেনো রাজ্যে বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে পাঁচ বছরের আগেই নির্বাচন হয়।
আবার সরকার পড়ে গেলে ভোট না করেও নতুন সরকার গঠন করা যায়, যেমনটি হয়েছিল গতবছর মহারাষ্ট্রে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার যদি বিধানসভায় অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে যায়, সেক্ষেত্রে রাজ্যপাল এমন কাউকে সরকার গঠনের জন্য ডাকতে পারেন, যার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ এমএলএ’র সমর্থন রয়েছে বলে মনে হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি রাজ্যপালের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন>> পারলে আমাদের হারান, নতুন জোট নিয়ে মমতার চ্যালেঞ্জ
কিন্তু এখন যেসব রাজ্যে সরকার চলছে এবং তার পূর্ণ মেয়াদ, অর্থাৎ পাঁচ বছর পর্যন্ত সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আশু কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই, তাদের নির্বাচনও একসঙ্গে করানোর প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা হবে? সেসব বিধানসভা কি ভেঙে দেওয়া হবে? পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলো কি সেই প্রস্তাব মেনে নেবে?
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রদীপ সিং বলেন, এ নিয়ে দুটি প্রস্তাব আগে থেকেই এসেছে। একটি হতে পারে, লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে আর পরে যেসব রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত হয়ে রয়েছে, সেগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে লোকসভার সঙ্গে করানো হলো।
‘দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো, বিজেপি ও সহযোগী দলগুলোর সরকার যেসব রাজ্যে রয়েছে, তারা নিজেরাই বিধানসভা ভেঙে দিলো এবং বাকি রাজ্যগুলোতে সরকার বরখাস্ত করে দেওয়া হলো।’
আরও পড়ুন>> সোনিয়া গান্ধী না নীতিশ, বিজেপিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেবেন কে?
নির্বাচন কমিশন একাধিকবার বলেছে, সারা দেশে একসঙ্গে নির্বাচন করানোর মতো পদ্ধতি তাদের রয়েছে।
কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। এত বড় দেশে একসঙ্গে নির্বাচন করাতে গেলে সংবেদনশীল এলাকাগুলোসহ অন্যান্য জায়গায় যত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করতে হবে, সেটি কি সম্ভব হবে?

পক্ষে-বিপক্ষে যত যুক্তি
সারা দেশে একসঙ্গে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন করানো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিজেপির মতপার্থক্য রয়েছে।
বিজেপির যুক্তি, একসঙ্গে সারা দেশে নির্বাচন হলে বিপুল নির্বাচনী খরচের অনেকটাই বেঁচে যাবে। সেই অর্থ দিয়ে দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবে, তাতে কমে যাবে রাজনৈতিক দুর্নীতি।
আরও পড়ুন>> ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হবে ভারত: মোদী
এছাড়াও একেক রাজ্যে একেক সময়ে নির্বাচন হওয়ার ফলে আদর্শ আচরণবিধি বলবৎ হয়ে যায়। এতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ থাকে- এই যুক্তিও দিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, আমাদের মতো দেশে যেখানে সম্পদ খুব বেশি নেই, সেখানে সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করতে হবে। দেশের একটা বিরাট খরচ হয়ে যায় এই নির্বাচনগুলো করতে গিয়ে। তার ওপরে যদি উপনির্বাচন হয় বা মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়- বিধানসভা বা লোকসভা উভয়েরই ক্ষেত্রে, তাতে বিপুল টাকা খরচ হয়ে যায়।
‘এরপরে ভোট এলেই আদর্শ আচরণবিধি চালু হয়, তাতে উন্নয়নের কাজ আটকে যায়। সব মিলিয়ে ভারতের মতো একটা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা নষ্ট হয়। এটি ভারতবর্ষের সামর্থ্যের বাইরে।’
তবে এই যুক্তির বিরোধিতা করছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। তার কথায়, ধরে নেওয়া যাক ২৮টি রাজ্য বিধানসভা ও লোকসভার নির্বাচন একসঙ্গে করানো হলো। সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়মে সেই সরকারগুলো ততদিন চলবে যতদিন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। কিন্তু তার আগে যদি কোনো সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তাহলে কী হবে? পাঁচ বছরের বাকি সময়টায় কি সেখানে কোনো নির্বাচিত সরকার থাকবে না?
তিনি বলছেন, এক রাষ্ট্র এক নির্বাচন নীতি ভারতের সংসদীয় ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সম্ভব না। এটি অবাস্তব।
আরও পড়ুন>> জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা, মোদীর সঙ্গে বৈঠকের আশা
কিন্তু বিজেপি নেতা বিমল নন্দের দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতি হলে এমন নিয়ম করতে হবে, যেখানে বিকল্প সরকার না গড়তে পারলে চলতি সরকার ফেলে দেওয়া যাবে না; যেমন- জার্মানিতে।
লাগবে সংবিধান সংশোধন
বিজেপির পাশাপাশি ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং আইন কমিশনও একসঙ্গে সারা দেশে নির্বাচন করানোর পক্ষে। তবে এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। একাধিক আইন, বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, যার মাধ্যমে ভারতে নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটিরও পরিবর্তন আনতে হবে।
এর ওপর দেশের অর্ধেক রাজ্যের আইনসভায়, অর্থাৎ ১৪টি রাজ্য বিধানসভা থেকে একসঙ্গে নির্বাচন করানোর প্রস্তাব পাস করিয়ে আনতে হবে।
তবে ১৪টি রাজ্যের বিধানসভা থেকে এই প্রস্তাব পাস করিয়ে আনতে খুব একটা সমস্যা হবে না বিজেপির। কারণ তাদের নিজেদের অথবা সহযোগী দলগুলোরই সরকার রয়েছে ১২টি রাজ্যে।
আরও পড়ুন>> নির্বাচনে চোখ/ গ্যাসের দাম ২০০ রুপি কমানোর ঘোষণা ভারতের
এর বাইরে উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র প্রদেশও নানা সময়ে বিজেপির দিকেই সমর্থন দিয়ে এসেছে এবং ওই দুটি রাজ্যের নির্বাচন সাধারণত লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই হয়ে থাকে। এছাড়া আরও দুই-তিনটি রাজ্য এই প্রশ্নে বিজেপিকে সমর্থন দিতে পারে।
এরপরে সংবিধান সংশোধন বিল যখন সংসদে যাবে, লোকসভার নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিজেপি সেখানে সহজেই বিলটি পাস করাতে পারবে। তবে রাজ্যসভায় যদি কংগ্রেস বিলের সমর্থনে না দাঁড়ায়, তাহলে সেটি পাস করানো কঠিন হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/