সুপ্রিম কোর্ট বার
নির্বাচনে ‘সবার অংশগ্রহণ’ প্রশ্নে পক্ষে-বিপক্ষে আইনজীবীরা
প্রতি বছর হওয়ার কথা থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবার প্রায় দুই বছর পর আগামীকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপ্রিম কোর্ট বার) নির্বাচন। এ নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্যানেল ছাড়া বাকি প্যানেলগুলো অংশ নিচ্ছে। সেগুলো হলো—সরকার (বিএনপি) সমর্থক জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল, বিরোধীদল (জামায়াত) সমর্থক আইনজীবী ঐক্য প্যানেল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত লাল-সবুজ প্যানেল।
১৩ ও ১৪ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। যদিও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাছাইয়ে তাদের মনোনয়ন টেকেনি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের লিখিত আবেদন ও সাধারণ আইনজীবীদের আপত্তির কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।
সুপ্রিম কোর্ট বার নতুন কোনো আইন তৈরি করেনি। সরকার যে আইন করেছে এবং গেজেট প্রকাশ করেছে, সেই আইনের ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বলছেন, বারের গঠনতন্ত্র ও নিয়ম ভঙ্গ করে অ্যাডহক কমিটি যাচাই-বাছাই ছাড়াই ৪০ জনের বেশি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে, যা অসাংবিধানিক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তাদের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি।
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে প্রার্থীদের পরিচিতি সভা
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বক্তব্য
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল জাগো নিউজকে বলেন, জুলাইযোদ্ধাসহ অনেকে সুপ্রিম কোর্ট বারে লিখিত দরখাস্ত দিয়েছেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেছেন।
নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর আমরা আশা করেছিলাম আইনজীবীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। আমরা চাই, আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হোক।
তারা বলেন, যারা পূর্বে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ব্যানারে নির্বাচন করেছেন বা সমর্থন করেছেন, তাদের যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বারের বিশেষ সাধারণ সভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
আরও পড়ুন
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে প্রার্থীদের পরিচিতি সভা
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল ঘোষণা
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের মনোনয়নপত্র দাখিল
আওয়ামীপন্থিদের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সভাপতি প্রার্থী হতে চাওয়া সিনিয়র অ্যাডভোকেট মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কেউ কোনো দলের বা সংগঠনের পক্ষ থেকে দলবদ্ধ হয়ে মনোনয়ন দাখিল করেননি।’
তিনি অভিযোগ করেন, বারের তথাকথিত বিশেষ সাধারণ সভার নোটিশ কোনো প্রার্থীকে না দিয়ে অ্যাডহক কমিটি মধ্যরাতে বার্তা (মেসেজ) পাঠিয়ে পরদিন দুপুরে সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অবৈধ ও নিন্দনীয়।
তিনি বলেন, ‘উৎসবমুখর পরিবেশে আইনজীবী সমিতিতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বারের সংবিধান ও নিয়ম ভঙ্গ করে এবং সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ৪০ জনের বেশি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার অপচেষ্টা অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।’
মুনসুরুল হক চৌধুরীর দাবি, অ্যাডহক কমিটির এ সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৭ বছরের ইতিহাসে ‘কলঙ্কজনক অধ্যায়’ হয়ে থাকবে। তিনি বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত বাতিল করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।
বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মোহাম্মদ আলী
সাধারণ আইনজীবীদের আগ্রহ
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আজহার উল্লাহ ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে কাউকে নির্বাচন করতে না দেওয়ার নজির নেই। অথচ এখন বলা হচ্ছে নির্বাচনই করতে দেওয়া হবে না। এতে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছে।’
উৎসবমুখর পরিবেশে আইনজীবী সমিতিতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বারের সংবিধান ও নিয়ম ভঙ্গ করে এবং সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ৪০ জনের বেশি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার অপচেষ্টা অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
তিনি বলেন, ‘অনেকে আমাদের প্রশ্ন করেন, আপনারা কি ভোট বর্জন করবেন? কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ আইনজীবীদের অনেকেই এ নির্বাচনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তারা বলছেন, এটি আমাদের সমিতির ঐতিহ্য নয়।’
আজহার উল্লাহ ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারকে বাঁচাতে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় আইনজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে হবে।’
তার দাবি, এ কারণেই ইউরোপের আইনজীবী সংগঠন কাউন্সিল অব বারস অ্যান্ড ল’ সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই) গত ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দেশের বিভিন্ন বারের নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।
নতুন তফসিলের দাবি
এদিকে সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন বাতিল করে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন করেছে গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি।
এ বিষয়ে সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর আমরা আশা করেছিলাম আইনজীবীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। আমরা চাই, আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হোক।’
তিনি বলেন, ‘অতীতেও একতরফা ভোট দেখেছি। এখনো অনেকেই কথা বলছেন না, চুপ আছেন।’
অতীত নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু এখন নয়, অতীতেও বিভিন্ন বারে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক আইনজীবী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।’
তিনি বলেন, ২০১৯ ও ২০২০ সালে ঢাকা ও অন্যান্য বারে সরকার সমর্থকদের বাইরে অন্য দলীয় আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ছিল। আবার ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বারে আইনজীবীদের গ্রেফতার ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
তার ভাষায়, এসব হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
জামায়াত সমর্থিত প্যানেল
আইনজীবীদের স্বার্থ
সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আইনজীবীদের মধ্যে এত দলীয়করণ ছিল না। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে আইনজীবী সংগঠনগুলো বিভক্ত হতে থাকে।
তিনি বলেন, ‘এক পক্ষ ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, আরেক পক্ষ আবার ক্ষমতায় ফিরতে চায়। কিন্তু সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থ নিয়ে কেউ কথা বলছে না। এ কারণেই সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ কমে গেছে।’
আমরা কি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছি?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আলী আহমেদ খোকন জাগো নিউজকে বলেন, ‘একসময় সুপ্রিম কোর্ট বারকে দেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তখন নেতৃত্বে কে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, সেটি মুখ্য ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুপ্রিম কোর্ট বার ও ঢাকা বারের নির্বাচন ঘিরে মারামারি, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এগুলো দুঃখজনক।’
খোকন বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম এবারের নির্বাচন সবার অংশগ্রহণে হবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছি?’
তার প্রশ্ন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বারের গঠনতন্ত্রের কোথায় আছে যে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না?
অতীতে অনেকে নির্বাচনই করতে পারতেন না
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. মোতাহার হোসেন সাজু জাগো নিউজকে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বারে বিএনপিপন্থি অনেক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এবার যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, অতীতে এ ধরনের পদ্ধতি থাকলে তাদের অনেকেই নির্বাচন করতে পারতেন না।
আ’লীগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আছে আইনজীবীদের
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, তাদের অনেকেই সময়মতো মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত দেখিয়ে তাদের বাতিল করা হলো।
তার দাবি, যে সাধারণ সভার কথা বলা হচ্ছে, সে সভার নোটিশ অনেক আইনজীবী ও প্রার্থীরা পাননি।
তিনি আরও বলেন, বারের নির্বাচনবিধিতে কোথাও উল্লেখ নেই যে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে।
আইন অনুযায়ীই আওয়ামী লীগ বাদ
আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বার নতুন কোনো আইন তৈরি করেনি। সরকার যে আইন করেছে এবং গেজেট প্রকাশ করেছে, সেই আইনের ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, কাউকে শারীরিক বা মৌখিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়নি। তারা এখন অভিযোগ করতে পারছেন, এটিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।
গাজী কামরুল ইসলাম সজল আরও বলেন, যে সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেই সংগঠনের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে আইনি পরিবর্তন হলে তারা আবার অংশ নিতে পারবেন।
সুপ্রিম কোর্ট বারে মনোনয়নপত্রে দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ছোট পরিসরে সবাই সবাইকে চেনেন। রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
নির্বাচন সাব-কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিচারপতি মিফতাহ্ উদ্দিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।
তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনি আইন বা বিধিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। তবে সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আমরা আশা করছি।
জামায়াতপন্থি প্যানেলের প্রত্যাশা
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে বিএনপিকে সহযোগিতা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কাউকে বৈধতা দিতে নির্বাচন করছি না। আমরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও আইনজীবীদের সমর্থনের ভিত্তিতে নির্বাচন করছি।’
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বারে যাই হোক, আমরা আশাবাদী সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে ভালো ফল করবো।
এফএইচ/এসএইচএস