কালো কিন্তু নিখুঁত, জানুন এই মডেলের গোপন তথ্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্য এখন আর শুধু রক্ত-মাংসের মানুষের একচেটিয়া সম্পদ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে এমন সব মুখ, যাদের হাসি, চোখের দৃষ্টি, শরীরী ভঙ্গি সবকিছুই নিখুঁত। এই নতুন বাস্তবতারই সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ নিয়া নোয়ার। সম্প্রতি যিনি টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয়ে ওঠেন ‘অতি আবেদনময়ী’, ‘বিশ্বের সেরা সুন্দরী’ এমন বিশেষণে।

নিয়ার টিকটক অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার ছাড়িয়েছে ২৭ লাখ। নাচের ভিডিও, ভ্রমণের ছবি, কিংবা সাধারণ একটি সেলফি সবকিছুতেই লাখো রিঅ্যাকশন, হাজার হাজার মন্তব্য। কেউ কেউ প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন করেছেন, কেউ আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনাও শুরু করেছেন। আর নিয়া? তিনি নিয়মিতই এসব মন্তব্যে প্রতিউত্তর দিয়েছেন, ইমোজি দিয়েছেন, কখনো রহস্যময় হাসি সব মিলিয়ে বাড়িয়েছেন ‘রিচ’ আর ‘এনগেজমেন্ট’।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পেছনে ছিল এক বিস্ময়কর শূন্যতা। নিয়া নোয়ারের জন্মস্থান জানা যায় না, পড়াশোনার ইতিহাস নেই, পরিবার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। নেই জাতীয়তা, নেই উচ্চতা বা ব্যক্তিগত জীবনের কোনো স্পষ্ট পরিচয়। এত বড় একজন তারকার জীবন এত অজানা এই প্রশ্নই একসময় কৌতূহল থেকে সন্দেহে রূপ নেয়।

অবশেষে যে সত্য প্রকাশ পায়, তা অনেকের জন্য ছিল চাঞ্চল্যকর। নিয়া নোয়ার আদতে কোনো মানুষ নন। তিনি একটি এআই দিয়ে তৈরি ডিজিটাল চরিত্র, একটি নিখুঁতভাবে ডিজাইন করা ভার্চুয়াল মুখ। তার হাসি, চোখের পলক, এমনকি মন্তব্যের উত্তরও পরিকল্পিত অ্যালগরিদমের ফল। নিয়া নামের এই কাল্পনিক চরিত্রের পেছনে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাকে ব্যবহার করেই আয় করছেন কোটি কোটি টাকা।
এআই ইনফ্লুয়েন্সার এখন নতুন কোনো ধারণা নয়। বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডগুলো বুঝে গেছে বাস্তব মানুষের মতো ঝামেলা নেই, বয়স বাড়ে না, বিতর্কে জড়ায় না। ইচ্ছেমতো কনটেন্ট বানানো যায়, সময় বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা নেই। নিয়া নোয়ার সেই ধারারই এক সফল প্রোডাক্ট।

স্পন্সরড কনটেন্ট, বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড প্রোমোশন সবই চলেছে নিয়ার মুখ ব্যবহার করে। দর্শক ভেবেছেন, তিনি একজন বাস্তব মানুষ। সেই বিশ্বাস থেকেই তৈরি হয়েছে আবেগ, আকর্ষণ, এমনকি প্রেমের অনুভূতি। আর এই আবেগই রূপ নিয়েছে অর্থনীতিতে। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট সব মিলিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়েছে বিশাল মূল্য।
নিয়া যে বাস্তব নন এই তথ্য সামনে আসার পর তার জনপ্রিয়তায় স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়ে। অনেক অনুসারী প্রতারিত বোধ করেছেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, ‘আমাদের অনুভূতিকে ব্যবহার করা হয়েছে।’ আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে প্রযুক্তির স্বাভাবিক অগ্রগতি হিসেবেও দেখছেন।

তবে প্রশ্ন থেকে যায় দোষটা কার? যারা নিয়া তৈরি করেছে, নাকি যারা চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কি আদৌ যাচাই করি, যাকে অনুসরণ করছি তিনি কে, কী?
নিয়া নোয়ারের গল্প আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। এআই যখন মানুষের মতো কথা বলতে পারে, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, তখন বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা কোথায়? আজ নিয়া একটি মডেল, কাল হয়তো সাংবাদিক, সমাজকর্মী কিংবা রাজনৈতিক মুখও এআই দিয়ে তৈরি হতে পারে। এই ঘটনা আমাদের ডিজিটাল সচেতনতার গুরুত্ব নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। শুধু সৌন্দর্য বা ভাইরাল ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে প্রশ্ন করতে শেখাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ পর্দার ওপারে যে মুখটি হাসছে, সে আদৌ মানুষ এমন নিশ্চয়তা আর নেই।

নিয়া নোয়ার হয়তো একটি কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু তার মাধ্যমে যে বাস্তব সত্য সামনে এসেছে, তা খুবই বাস্তব; ডিজিটাল যুগে বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় পুঁজি আর সেই বিশ্বাসই সবচেয়ে সহজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ইউনিল্যান্ড
জেএস/