জরুরি অবস্থায় দিশেহারা নয়, সচেতন সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে প্রাণ
হঠাৎ তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা প্রসবকালীন জটিলতা এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতি যে কাউকে আতঙ্কিত করে তুলতে পারে। অনেক সময় কী করতে হবে না জানার কারণে দেরি হয়ে যায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ায়। অথচ সামান্য সচেতনতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে পারে মা ও শিশুর।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থায় সবচেয়ে বড় ভুল হলো ভয় পেয়ে সময় নষ্ট করা। তিনি মনে করেন, আগে থেকেই কিছু মৌলিক বিষয় জানা থাকলে বিপদের সময় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।
কোন পরিস্থিতিগুলোকে জরুরি হিসেবে ধরতে হবে?
অনেকেই বুঝতে পারেন না কখন পরিস্থিতি সত্যিই বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে ব্যবস্থা নিতে হবে-
- হঠাৎ করে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- তীব্র তলপেট বা কোমর ব্যথা
- গর্ভাবস্থায় শিশুর নড়াচড়া হঠাৎ কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া
- প্রসবের আগেই পানি ভেঙে যাওয়া
- মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি
এসব লক্ষণ শুধু প্রসূতির জন্য নয়, যেকোনো নারীর ক্ষেত্রেই বিপদের ইঙ্গিত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
- সুস্থ মাতৃত্বের প্রথম ধাপ, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- মাসিক ও হরমোনের সমস্যায় সচেতনতা জরুরি
- বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না?
জরুরি অবস্থায় প্রথম করণীয় কী?
ডা. রেজাউল করিম কাজলের মতে, প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ ভয় পেলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তারপর যা করতে হবে-
- রোগীকে নিরাপদ অবস্থায় শুইয়ে রাখা: অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে রোগীকে চিত করে শুইয়ে পা সামান্য উঁচু করে রাখতে হবে।
- খাবার বা পানি না দেওয়া: অনেক সময় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিছু খাওয়ানো ঠিক নয়।
- নিজে নিজে ওষুধ না দেওয়া: ব্যথা কমানোর জন্য ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়ানো বিপজ্জনক হতে পারে।
- দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হওয়া: সময় নষ্ট না করে এমন হাসপাতালে যেতে হবে, যেখানে প্রসূতি ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা আছে।
প্রসবকালীন জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রস্তুত থাকবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলেন, গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই কিছু প্রস্তুতি থাকলে বিপদের সময় দৌড়ঝাঁপ কমে যায়-
- গর্ভকালীন নিয়মিত ডাক্তার দেখানো
- সম্ভাব্য প্রসবের তারিখের আগেই কোন হাসপাতালে যাবেন তা ঠিক করা
- জরুরি যোগাযোগ নম্বর লিখে রাখা
- রক্তের গ্রুপ জানা ও প্রয়োজনে রক্তদাতার ব্যবস্থা রাখা
- একটি জরুরি ব্যাগ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা
বাড়িতে প্রসব শুরু হলে কী করবেন?
হঠাৎ প্রসব ব্যথা শুরু হয়ে গেলে দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। যাত্রাপথে মাকে আরামদায়ক অবস্থায় বসানো বা শোয়ানো জরুরি। প্রসব নিজে করানোর চেষ্টা করা উচিত নয়, যদি না প্রশিক্ষিত কেউ উপস্থিত থাকে।
ডা. কাজল জানান, অনেক সময় ‘আর একটু অপেক্ষা করি’ ভেবে মানুষ দেরি করে, যা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
কেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি?
প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ, উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা বা সংক্রমণ এসব সমস্যায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছালে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সবশেষে ডা. কাজল বলেন, জরুরি অবস্থা কখনোই পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। তাই আগে থেকেই জানা থাকুক কী করলে বিপদের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। ভয় নয়, সচেতনতা; দেরি নয়, দ্রুততা এই দুটিই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
জেএস/