হাওরের ফসল রক্ষায় সরকারের বড় উদ্যোগ
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অধ্যুষিত এলাকায় প্রতি বছরই আগাম বন্যা ও বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় শত শত হেক্টর জমির বোরো ধান। এতে অনেকটা নিয়মিতই ফসল হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষক। এ অবস্থায় আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষায় হাওর অঞ্চলের ১৩টি নদী ড্রেজিংয়ের প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার।
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে প্রায় ১৯৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি আগাম বন্যা থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বর্তমান পর্যায়ে ড্রেজিংয়ের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনটি রিভার সিস্টেমও খনন করা হবে। এগুলো হলো, সুরমা-বাউলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম ও আবুয়া-পাটনাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম।
‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এসব নদী ড্রেজিং করা হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, জনগণের মতামত যাচাই এবং হাওরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে এসব নদী ড্রেজিংয়ের জন্য কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রকল্পের আওতায় সুরমা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বাউলাই-পাটনাই, গাং ও আবুয়া নদী খনন করা হবে। এসব নদীর মধ্যে ৮টি সুনামগঞ্জে ৫টি কিশোরগঞ্জে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বর্তমান পর্যায়ে ড্রেজিংয়ের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনটি রিভার সিস্টেমও খনন করা হবে। এগুলো হলো, সুরমা-বাউলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম ও আবুয়া-পাটনাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম। এসব সিস্টেমের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি সুরক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
হাওরে পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন
সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে দিলো দুর্বৃত্তরা
হাওরে গোখাদ্য সংকট, ঈদের আগেই অনেকে বিক্রি করছেন গবাদিপশু
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২) মো. ইমদাদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, হাওরের ১৩টি নদী ড্রেজিং করলে আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষা করতে পারবো। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাকে বাংলাদেশের শস্যভান্ডার বলা হয়। এই এলাকার অর্থনীতি মূলত ধান ও মাছ উৎপাদননির্ভর।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য। এই অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির পানি ভারতের বিভিন্ন নদী দিয়ে সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে এবং সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে মেঘনায় পতিত হয়। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদীর তলদেশ পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত সময় লাগে।

মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশনে বিলম্বের ফলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বোরো ফসল রক্ষাকারী ডুবন্ত বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া প্রতিবছর হাওরের পানি নিষ্কাশন বিলম্বের কারণে হাওরে বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুত ও চারা রোপণের সময়ও কমে আসে। এ অবস্থায় হাওর অঞ্চলে নদ-নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অন্তর্বর্তী খালগুলো খনন করা প্রয়োজন।’
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে সভা করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। প্রস্তাবিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ১৬ উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পিইসি সভায় প্রকল্পের বেশকিছু বিষয়ে সাময়িকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে সেসব খাতে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়ের কারণ উল্লেখ করে বাপাউবো।
সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদীর তলদেশ পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত সময় লাগে। আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশনে বিলম্বের ফলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বোরো ফসল রক্ষাকারী ডুবন্ত বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।— পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পের আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং বাবদ খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পিইসি সভায় প্রকল্পে ১২টি মোটরসাইকেল বাবদ ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার সংস্থান রাখার যৌক্তিক কারণ জানতে চাওয়া হয়। এসময় বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন যে, তিন জেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ১২টি মোটরসাইকেলের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সভায় সবাই ঐকমত্য হন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ) বাবদ ২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫টি অনাবাসিক ভবন মেরামত বাবদ ৮০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন, ৫টি অনাবাসিক ভবন মেরামতের সংস্থান বাদ দিয়ে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো) নির্মাণের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সবাই একমত হন। প্রকল্পের আওতায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
মৌলভীবাজারে বাড়ছে হাওরের পানি, নতুন করে ডুবছে ধান
আগাম বন্যার ঝুঁকি, হাওরে বোরো নিয়ে শঙ্কা
হাওরে বন্যার আগেই ঘরে উঠবে ধান, বাকৃবি গবেষকদের সফলতা
কথা হয় পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমানোর জন্য এর আগে গঠিত কমিটি সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা পরিদর্শন করে। পরবর্তীসময়ে হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় চেইনেজ আউটলেটের অবস্থান এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় খাল চিহ্নিত করা হয়। প্রকল্পের ডিপিপিতে ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণ এবং খাল পুনঃখনন কাজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছি।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা সভা করেছি। সভায় সবার সিদ্ধান্তের আলোকে প্রকল্পের প্রতিটি খাতের যৌক্তিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়। পাহাড়ি এলাকার এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত ধেয়ে আসে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায়। ফলে প্রতিবছর আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলার হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হাওর এলাকার নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে নদীর পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে আগাম বন্যার পানি হাওর অঞ্চল থেকে ভাটির দিকে নিষ্কাশিত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে হাওরের নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
এমওএস/কেএসআর/এমএফএ