স্কুলের কথা মনে হলে কান্না আসে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কক্সবাজার থেকে
প্রকাশিত: ০৮:৫০ এএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ছবি : মাহবুব আলম

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে এখনও বইছে রোহিঙ্গাদের ঢেউ। দিনের আলো শেষে রাতেও ত্রাণের জন্য হাহাকার করে উখিয়া-টেকনাফ সড়ক। অন্ধকার রাতেও রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের হাত দেখা যায় সড়কে সড়কে। অনাহার-অর্ধাহারে থাকা রোহিঙ্গারা সামান্য ত্রাণের জন্য মরিয়া।

তেমনি একজন রোহিঙ্গা কিশোরী নাসিমা। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে ত্রাণের জন্য নয়, ও এসেছে ক্যাম্পের অন্য মেয়েদের সঙ্গে ত্রাণ নিতে আসা মানুষদের দেখতে। রাতের আধাঁর ওর গায়ে ভর করেছে নাকি ও’ই রাতের আঁধারকে আরও ঘনীভূত করেছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না।

গায়ের রং শ্যামলা। চোখগুলো কুচকুচে কালো। কালো স্কার্ট পরা। তেল দেয়া মাথায় চুলে সিঁথি। অন্ধকারেও চুলে দেয়া তেল চিকচিক করছিল। কালোয় কালোয় মিলে রূপের যে আঁধার নামতে পারে, নাসিমায় তা প্রকাশ। কৃষ্ণরূপের এত মোহ! এত জাদু? তা ১৪ বছরের রোহিঙ্গা এই কিশোরী মেলে ধরেছে।

নাসিমার বাবা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ইউনিসেফ অফিসে পিয়নের চাকরি করতেন। ছয় বোন আর এক ভাই নিয়ে নাসিমার পরিবারে সুখের শেষ ছিল না। ভাই-বোনেরা সবাই স্কুল-কলেজে যেত। নাসিমা নিজেও বৌদ্ধ মগদের পরিচালিত স্কুলের আট ক্লাসের (অষ্টম শ্রেণির) ছাত্রী। ইংরেজি আর বার্মিজ ভাষার ওই স্কুলে বাংলা পড়েনি নাসিমা।

Nasima

প্রাণ ভয়ে পরিবারের সবাই বাবা সালামের হাত ধরে পালিয়ে এসে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে তাবু গেড়েছে। কিছু টাকাও সঙ্গে এনেছিল নাসিমার পরিবার। তা দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছে। থাকেন সবাই একই পলিথিনের নিচে।

ক্যাম্পের আর দশজন মেয়ে থেকে পরিপাটি দেখালেও হৃদয়ের দহন নাসিমাকে বিষণ্ন করে রেখেছে। বলেন, ‘আমাদের সবার জন্যই একটি করে কক্ষ ছিল। এখন একই পলিথিনের নিচে ঘুমাই। গোসলও করতে পারি না।’

স্কুলের কথা বলতেই ওর চোখ অশ্রুতে ভেসে গেল। নাসিমা বলেন, ‘স্কুলের কথা মনে হলে কান্না আসে। বৌদ্ধ বান্ধবীদের কথা মনে হলে কান্না পায়। মুসলমান ছিলাম বলে বৌদ্ধ স্যাররা আমাকে অনেক আদর করত। আর সেই বৌদ্ধরাই আমাদের দেশ ছাড়া করল।’

ফের মিয়ানমার যাবে কি না জানতে চাইতে নাসিমা সরল উক্তি, ‘গ্রামের বাড়ির কথা মনে পড়লে ঘুম আসে না। বাবা নিয়ে গেলে দেশে চলে যাব।’

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জঙ্গিরা রাখাইনে কয়েকটি পুলিশ চেক পোস্টে হামলা চালায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হয়। এরপরই নৃশংস অভিযানে নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ওই অভিযান শুরুর পর জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।

এএসএস/আরএস/পিআর

টাইমলাইন