সদরঘাটে যত ঘাট

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম লোকপরিচিত নদী বুড়িগঙ্গা। একসময় ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল। বলা চলে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর সন্তান বুড়িগঙ্গা। ঢাকার বুকে খেয়া পারাপারের কথা চিন্তা করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর একপাড়ে সদরঘাট, অন্যপাড় কেরানীগঞ্জ। যুগ যুগ ধরে দু’পাড়ের মানুষের মেলবন্ধ তৈরি করেছেন বুড়িগঙ্গার মাঝিরা।

আবহমান যুগ থেকেই ব্যস্ততম নদী বুড়িগঙ্গার দু’পাড়জুড়ে গড়ে উঠেছে কত শত নৌঘাট। আবার কালের বিবর্তনে বিলীনও হয়েছে অনেক ঘাট। বুড়িগঙ্গার দু’পাড়জুড়ে পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে সোয়ারীঘাট পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি নৌঘাট রয়েছে। একেকটি ঘাটে ৫০ থেকে ১০০টি নৌকা থাকে। ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ভেড়ানো থাকে এই ঘাটগুলোতে।

নিত্যদিন এ ঘাটগুলো ব্যবহার করে দু’পাড়ের হাজারও মানুষ। এপাড় ওপাড় কোটি কোটি টাকার মালামাল ওঠানামা হয় এই খেয়া ঘাটগুলো দিয়েই। অথচ প্রাচীন এই ঘাটগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না।

চলুন জেনে নেয়া যাক বুড়িগঙ্গার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাট সম্পর্কে

লালকুঠি ঘাট

ঐতিহ্যবাহী শ্যামবাজারের সম্মুখেই লালকুঠি ঘাটের অবসস্থান। লাল রঙের ইমারতবিশিষ্ট নর্থব্রুক হল তথা লালকুঠির নাম অনুসারেই এ ঘাটটির নামকরণ। বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম পাড়ের সিমসন ঘাট ও লালকুঠি ঘাট খেয়া নৌকা চলাচলের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত। চাঁদপুরগামী যাত্রীরা এই ঘাট দিয়েই যাতায়াত করেন। খেয়াঘাট দুটি দিয়ে চলাফেরা করেন কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীসহ এই এলাকার হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া এই ঘাট দিয়েই কেরানীগঞ্জ থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক আনা-নেয়া করেন সারাদেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

ওয়াইজ ঘাট

বুড়িগঙ্গা তীরের নীলকর জেপি ওয়াইজের বাসভবনের সামনের সিঁড়িযুক্ত ঘাটটিই ওয়াইজ ঘাট। তৎকালীন নীলকর ওয়াইজের নামে এই ঘাটের নামকরণ করা হয়। বুড়িগঙ্গার নৌঘাটগুলোর মধ্যে এটি বহুল ব্যবহৃত একটি ঘাট। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের বহু লোক প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করেন। এছাড়া কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টপল্লীর হাজার হাজার ব্যবসায়ী, শ্রমিক, সাধারণ জনগণ এ ঘাট ব্যবহার করেন।

jagonews24

বাদামতলী ঘাট

ঢাকার বিখ্যাত পাইকারি ফলের আড়তের সামনেই বাদামতলী ঘাট। ওয়াটার বাসের মাধ্যমে ঢাকার গাবতলী ও সাভারে আসা-যাওয়ার জন্য বাদামতলী ঘাট বহুল ব্যবহৃত। এছাড়া মালামাল আনা-নেয়ার জন্য সবসময় বড় নৌকা-স্টিমার ভিড় জমায় এখানে। দেশের বিখ্যাত ফলের আড়ত এই ঘাট সংলগ্ন হওয়ায় এখানে খেয়া পারাপারের চেয়ে ফলের আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাই এটি বেশি ব্যবহার করেন।

শ্যামপুর ঘাট

এই ঘাটকে শ্যামবাজার ঘাটও বলা হয়। শ্যামবাজার মাঝরাস্তার পাশেই এই ঘাটটি অবস্থিত। এই ঘাটটি কেবল বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হয়। প্রতিদিন বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, সাভার থেকে প্রচুর কাঁচামাল এই ঘাট দিয়ে আনা-নেয়া করেন ব্যবসায়ীরা। এই ঘাটে ভোরবেলায় মাল আনা-নেয়ার জন্য ছোট বড় নৌকা ও ট্রলার এসে ভিড় জমায়।

বিনাস্মৃতি স্নানঘাট

ঐতিহাসিককাল থেকেই এই ঘাটটি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের পূজা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় দেবী বিসর্জন ও স্নান করার জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে ধীরে ধীরে এটি খেয়াঘাট হিসেবে মাঝিরা ব্যবহার করতে থাকেন। নিয়মিত এখানে ৫০ থেকে ৬০টি নৌকা নিয়ে মাঝিরা অবস্থান করেন। দুর্গাপূজার উৎসবের সময় দেবী বিসর্জন উপলক্ষে ঘাটটি দুইদিন বন্ধ থাকে।

সোয়ারীঘাট

বুড়িগঙ্গার খেয়া ঘাটগুলোর মধ্যে সোয়ারীঘাট অন্যতম এবং ঐতিহ্যবাহী একটি ঘাট। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকায় যাওয়ার জন্য নিয়মিত প্রচুর যাত্রী এই ঘাট ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়া সোয়ারীঘাট এলাকায় বিখ্যাত একটি মাছের আড়ত থাকায় প্রতিদিন ভোরে নৌকা, স্টিমারে করে ব্যবসায়ীরা এখান থেকে মাছ আনা-নেয়া করেন। ঘাটটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সোয়ারীঘাটের আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিশেষ করে বর্ষাকালে সোয়ারীঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ ভিড় করেন এই ঘাটে।

jagonews24

বালুঘাট

নাম বালুঘাট হলেও এই ঘাট দিয়ে এখন আর বালু আনা-নেয়া হয় না। বালুঘাটের বিপরীত ঘাটটি হলো বিলকাঠুরিয়া ঘাট। একসময় বালু আনা-নেয়ার জন্য বড় বড় ট্রলার-স্টিমার এখানে এসে ভিড় জমাত। কিন্তু বর্তমানে এটি কেবল যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

পানঘাট

এই ঘাটকে ঈমামগঞ্জ ঘাটও বলা হয়ে থাকে। যার অপরপাশে রয়েছে থানার ঘাট। জিঞ্জিরা থানার পাশে এই ঘাটটি অবস্থিত বলে লোকমুখে এটি থানার ঘাট নামেই পরিচিত। জিঞ্জিরায় আসা-যাওয়া করার জন্য এই ঘাটটি বহুল ব্যবহৃত।

মিটফোর্ড ঘাট

বাবুবাজার ঘাটের পাশেই মিটফোর্ড ঘাট। মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছনেই এই ঘাটটি অবস্থিত। মূলত এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই ঘাটটির যাত্রা শুরু। এই ঘাট দিয়ে ওপাড়ের কালীগঞ্জ ঘাটে যাওয়া-আসা করেন হাজারও মানুষ।

বাবুবাজার ঘাট

বুড়িগঙ্গার বড় একটি ঘাট হলো বাবুবাজার ঘাট। বাবুবাজার ব্রিজের নিচেই এই ঘাট অবস্থিত। ঘাটটির অপরপাড়েই কাঠুরীঘাট। বিশেষ করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মানুষজন এই ঘাটটি ব্যবহার করে থাকেন। নিয়মিত ৭০ থেকে ৮০টি ছোট ও মাঝারি নৌকা এই ঘাটে সারি সারি হয়ে যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকেন। এছাড়া এই ঘাট দিয়ে ছোট ট্রলারের মাধ্যমে গাবতলী, সাভারে যাতায়াত করা হয়।

jagonews24

রাজারঘাট

বুড়িগঙ্গা নদীর ঐতিহ্যবাহী একটি ঘাট হলো রাজারঘাট। অন্যান্য ঘাটের মতো এই ঘাট দিয়ে যাত্রীদের আসা-যাওয়া করার নিয়ম নেই। এটি মালবাহী ঘাট হিসেবে পরিচিত। মাল আনা-নেয়ার জন্য ছোট বড় স্টিমার ও ট্রলার এই ঘাটে অবস্থান করে থাকে।

মাছঘাট

সোয়ারীঘাটের বিভিন্ন দেশি মাছের আড়তের সামনেই ছোট এই ঘাটটি অবস্থিত। এই ঘাট দিয়ে যাত্রীদের তেমন একটা যাতায়াত করতে দেখা যায় না। মাছের আড়ত হওয়ার কারণে আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই ঘাট ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়া কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ও মুন্সিগঞ্জ থেকে এখানে বিক্রেতারা মাছ নিয়ে আসেন।

এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদীতে আরও রয়েছে- চম্পাতলী ঘাট, চাঁদনী ঘাট, ব্যাপারী ঘাট, গুদারা ঘাট, কুড়ার ঘাট, ফরাশগঞ্জ ঘাট। এই ঘাটগুলো তুলনামূলক কম ব্যবহার হয়ে থাকলেও বুড়িগঙ্গায় খেয়াঘাট হিসেবে রয়েছে যুগের পর যুগ।

বুড়িগঙ্গা ঘিরেই প্রাচীন ঢাকা। রাজধানী ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা ও এর ঘাটগুলো জড়িত। কিন্তু কালের বিবর্তনে গুটিকয়েক ঘাট বাদে হারিয়ে যেতে বসেছে অধিকাংশ নৌঘাট। সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে বুড়িগঙ্গার মাঝিদের দাবি- নৌঘাটগুলো সংস্কার করে যেন এপার-ওপারের যাত্রীদের আসা-যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। দুইপাড়ের মানুষের মেলবন্ধন তৈরি করে বুড়িগঙ্গার হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরিয়ে আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

রায়হান আহমেদ/এমআরআর/বিএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]