দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের চার বছর, নেই কোনো আয়োজন
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এ ম্যানগ্রোভ বনের বিস্তৃতি দেশের পাঁচটি জেলায়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ বন বাংলাদেশের ঢাল। বুক চিতিয়ে সে ঠেকিয়ে দেয় মহাবিপদ। বঙ্গোপসাগরঘেঁষা উপকূলীয় বহু মানুষের জীবন-জীবিকা এ বন ঘিরে। এক সময় জলদস্যুর হানা দিয়েছিল এসব মানুষের কাছে জমের মতো। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সেই বন এখন দস্যুমুক্ত, যা বন ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের আগে তাদের বড় আতঙ্ক ছিল জলদস্যু ও বন দস্যুদের উৎপাত। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই হিসেবে আজ (মঙ্গলবার) ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’র চতুর্থ বর্ষপূর্তি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, দিকনির্দেশনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান এবং এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কর্মতৎপরতায় দস্যুমুক্ত হয় সুন্দরবন। এ সাফল্য অর্জনে র্যাব পেয়েছে দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা।
২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে র্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে গোড়াপত্তন ঘটে জলদস্যু মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার। ২০১২ সাল থেকে লিড এজেন্সি হিসেবে র্যাবের জোরালো অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জলদস্যুরা। উপর্যুপরি অভিযানে ফেরারি জীবনের অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন জলদস্যুরা।
২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য, ৪৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন। ফলে সম্পূর্ণরূপে জলদস্যুমুক্ত হয় সুন্দরবন। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী এ সাফল্যের ঘোষণা দেন। গত চার বছর র্যাব এ সাফল্য ধরে রেখেছে।
র্যাব জানায়, জলদস্যুদের পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রত্যেককে নগদ এক লাখ টাকা আর্থিক অনুদান, আইনি সহায়তা ও র্যাবের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তাসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। ফলে সুন্দরবনের সব জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। সম্প্রতি র্যাব পুনর্বাসন চাহিদা সমীক্ষা চালিয়ে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের মধ্যে ঘর, দোকান, নৌকা, জাল ও গবাদিপশু হস্তান্তর করতে যাচ্ছে, যা তাদের স্বাবলম্বী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে শান্তির সুবাতাস বইছে সুন্দরবনে। অপহরণ ও হত্যা এখন অতীত। জেলেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের ভাগও কাউকে দিতে হচ্ছে না। মৌয়াল, বাওয়াল, বন্যপ্রাণী এখন সবাই নিরাপদ। নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে আসছে দর্শনার্থী-পর্যবেক্ষক, জাহাজ, বণিক। এভাবেই সরকারের দূরদর্শিতায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
স্বাভাবিক জীবনে দস্যুরা
বর্তমানে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুরা পুনর্বাসিত হয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাবেক জলদস্যুদের প্রত্যেককে নগদ এক লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের ঘর, দোকান, নৌকা, জাল ও গবাদি পশু হস্তান্তর করেছে সরকার। যা তাদের স্বাবলম্বী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণকারী সব জলদস্যু ও বনদস্যুদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের (হত্যা ও ধর্ষণ) মামলা ব্যতীত অন্যান্য সব সাধারণ মামলা সহানুভূতি সহকারে বিবেচনার বিষয়টি চলমান।

দস্যুমুক্ত সুন্দরবন দিবস
গত বছরের ১ নভেম্বর দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের বর্ষপূর্তিতে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে র্যাব। অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের মধ্যে ঘর, মুদি দোকান (মালামালসহ), জাল, মাছ ধরার নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও গবাদিপশু উপহার তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তবে এবার চতুর্থ বছর পূর্তিতে কোনো আয়োজন রাখা হয়নি।
দস্যুমুক্ত হবার পর ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে সিনেমা
র্যাব ওয়েলফেয়ার কো-অপারেটিভ সোসাইটি নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সারাদেশে ছবিটি মুক্তি পায়। সিনেমাটির পরিচালক দীপঙ্কর দীপন। এতে অভিনয় করছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ, সিয়াম আহমেদ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, রৌশান, নুসরাত ফারিয়া, শতাব্দী ওয়াদুদ, সামিনা বাশারসহ আরও অনেকে। এছাড়া প্রায় এক হাজার ৩০০ আর্টিস্ট সিনেমাটিতে কাজ করেন। যা ব্যয়বহুল একটি সিনেমা।
চলচ্চিত্রটির সংশ্লিষ্টরা বলছে, অপারেশন সুন্দরবন কোনো লাভজনক চলচ্চিত্র নয়। সমাজ সংস্কারমূলক চলচ্চিত্র।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জাগো নিউজকে বলেন, র্যাব পাঁচটি পর্বে দস্যুমুক্ত সুন্দরবন বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তা হলো- অভিযান, আত্মসমর্পণ, পুনর্বাসন, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। র্যাব প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে ৭৭৯ জন জলদস্যু গ্রেফতার হয়েছেন। র্যাবের তত্ত্বাবধানে জলদস্যু পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে ‘সুন্দরবনের হাসি’ নামে প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।
চতুর্থ বর্ষপূর্তি হিসেবে র্যাবের অনুষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, আজ কোনো অনুষ্ঠান নেই। তবে চলতি মাসে আমরা একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছি।
টিটি/আরএডি/এমএস