১ কিমি রাস্তায় ২০ কোটি টাকা কোন দেশে লাগে, প্রশ্ন ফরাসউদ্দিনের
‘এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে বিশ্বের কোন দেশে ২০ কোটি টাকা লাগে’- এমন প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। অবশ্য এরপর তিনি নিজেই এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন।
ড. ফরাসউদ্দিন বলেছেন, ‘আমাদের দেশে উন্নয়নকাজে কেনাকাটায় সম্পূর্ণ নৈরাজ্য চলছে। বিশ্বের কোন দেশে এক কিলোমিটার রাস্তা করতে ২০ কোটি টাকা লাগে? হ্যাঁ, আমাদের দেশে লাগে এবং তা অনেক বেশিই লাগে। তারা এত সাহস কোথা থেকে পান? তবে এটা পরিকল্পনা কমিশন যে ধরেছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
মঙ্গলবার (৯ মে) ‘দেশ রূপান্তরের কারিগর শেখ হাসিনা’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বইটি সম্পাদনা করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. শামসুল আলম।
আরও পড়ুন>> সড়কের ৫ প্রকল্পে ২৫৮৮ কোটি টাকা ব্যয় অনুমোদন
দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নৈরাজ্য চলছে মন্তব্য করে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘এ দেশে কেন প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হয় না? বেশি সময় লাগে কেন? পৃথিবীর সব দেশে যে প্রকল্পে সময় বেশি লাগে, তাদের (প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ও ঠিকাদার) জরিমানা করা হয়। আর এখানে (বাংলাদেশ) প্রকল্পের আকার বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এটা কী ধরনের কথা? গরিব মানুষের টাকা; সেটা হোক করের টাকা বা ধার করে আনা মাথাপিছু ঋণের টাকা, তা দিয়েই তো এসব প্রকল্প করা হয়।’
উন্নয়ন প্রকল্পে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরামর্শও তুলে ধরেন সাবেক এ গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আমি একটা পরামর্শ দিয়েছিলাম। সেটা হলো- কিছু মেগা প্রকল্পকে স্লো-ডাউন করে তাদের ডোনারদের সঙ্গে আলোচনা করুন। রি-সিডিউল করে রি-পেমেন্টটাকে স্লো-ডাউন করলে ভালো হতো। পরিকল্পনা কমিশনকে প্রশ্ন করবো- পণ্য ও সেবা জনগণের টাকা দিয়ে যা ব্যবহার করি, বিশ্বমানের নিরিখে কেন মূল্য নির্ধারণ করে দেই না? যেসব ঠিকাদার বেশি দাম দেবেন, আমি তাদের অটোমেটিকলি অনুত্তীর্ণ করবো।’
আরও পড়ুন>> ৩ কোটি ‘ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড’ কিনবে সরকার, খরচ ৪০৬ কোটি টাকা
উন্নয়নে বৈষম্য প্রসঙ্গে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘অমর্ত্য সেন বলেছেন, ২০১৯ সাল থেকে আমরা (বাংলাদেশ) ভারতের চেয়ে এগিয়ে আছি। কিন্তু সেটা তো সামষ্টিক। ব্যক্তিপর্যায়ের বৈষম্যের কথা যদি আলোচনা করি, তাহলে আমি কী সমাজের ক্ষুদ্র (দরিদ্র) মানুষটার প্রতি সুবিচার করছি? যদি বছরে ৭০০ কোটি ডলার পাচার হয়...। আর এসব কথা যদি আমরা আমলে না নিয়ে শুধু শেখ হাসিনার প্রসংশা করে যাই, তাহলে কি তার (দরিদ্র ব্যক্তি) প্রতি সুবিচার করা হবে? এসব বন্ধ করার কি কোনো ব্যবস্থা নেই? আমি তো মনে করি, অবশ্যই আছে..।’
যারা অর্থপাচার বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন বা করতে চেয়েছিলেন, তাদের কর্মস্থল থেকে বদলি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে সাবেক এ গভর্নর বলেন, ‘যারা ব্যবস্থা করেছিলেন, তাদের তো বদলি করা হয়েছে। কাজটা হবে কীভাবে?’
আরও পড়ুন>> ৭ বছরে সর্বনিম্ন রিজার্ভ
তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনো কারণেই হোক বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে আসছে না। যেখানে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকসহ অনেকেই বলছেন, আড়াই কোটি মানুষের কাছে মাথাপিছু আয় পাঁচ হাজার ডলার আছে। মানে ছয় লাখ টাকা। তাহলে ৩০ লাখ লোক কেন কর দেবেন? বাকিদের কাছ থেকে আমি কেন কর আদায় করতে পারবো না। কাউকে কষ্ট দিয়ে কর যদি আদায় করতে না পারি, তাহলে কি বিনিয়োগ জিডিপি ৪০ শতাংশে যাবে? ৪০ শতাংশে না গেলে আমি কি দ্বিগুণ জিডিপি করতে পারবো?’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল বায়েস, পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদী সাত্তার, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়েক সেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনজুর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক সচিব মো. খুরশেদ আলম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রমুখ।
আরও পড়ুন>> নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে সবজির দাম, মুলার কেজিও ৮০
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার সাহস ও জিদের কারণেই অনেক বাধার পরও পদ্মা সেতু প্রকল্প সফল হয়েছে। দেশের অনেক উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহস নিয়ে কাজ করেন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস বলেন, ‘শেখ হাসিনার প্রচণ্ড সাহস ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা আছে। যার কারণে সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্প আলোর মুখ দেখেছে।’
এমওএস/এএেএইচ/এমএস