কলার লোকেশন ট্র্যাকার

ভুক্তভোগীকে দ্রুততম সময়ে সেবা দেবে ৯৯৯, ডিসেম্বরের মধ্যে চালু

রাসেল মাহমুদ
রাসেল মাহমুদ রাসেল মাহমুদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২২ এএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

২০২০ সালের ঘটনা। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রামের ছয় কিশোর ও যুবক সুন্দরবন ঘুরে দেখার পরিকল্পনা করেস। ৭ জুন সকালে সঙ্গে সামান্য পানি ও চিপস নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েস গহীন বনে। একপর্যায়ে হারিয়ে ফেলেস দিক। এরই মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড বাতাস-বৃষ্টি। আটকা পড়েন তারা। খাবার-পানিও শেষ হয়ে যায়। সন্ধ্যা নেমে রাত বাড়তে থাকে। সবার মধ্যে বাড়তে থাকে বাঘ আতঙ্ক। আশ্রয় নেন গাছের ডালে।

এরপর দলের একজন রাত ১০টায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সহায়তা চান। জাতীয় জরুরি সেবা শরণখোলা থানা পুলিশকে জানালে তারা ধানসাগর নৌ-পুলিশকে নিয়ে রাত ১১টা থেকে অভিযান শুরু করে। আটকে পড়া যুবকরা তাদের অবস্থান বলতে না পারায় পরদিন ভোর ৪টার দিকে বনের পাঁচ কিলোমিটার ভেতর থেকে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ।

আরও পড়ুন>> শব্দ যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিদিন ২২ জন কল করে ৯৯৯ এ

শুধু বন-জঙ্গল, নদী বা গভীর সমুদ্রে পথ হারিয়েই নয়, পাচারের শিকার হয়ে কোথাও আটকে থাকলেও সঠিক অবস্থান বলতে না পারায় অনেক সময় উদ্ধার করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এমন হাজারো বিড়ম্বনা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চালু হওয়ার পর থেকেই। প্রতিদিন ২২ থেকে ২৫ হাজার ফোন কলারের পরিচয় জানতে সময়ক্ষেপণ, অযাচিত ফোন কলসহ নানা সমস্যা ও সাড়া দেওয়ার সময় কমিয়ে আনতে কলার লোকেশন ট্র্যাকার চালুর চিন্তা করে ৯৯৯ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু করোনা মহামারিসহ নানা কারণে এখনো তা পুরোপুরি চালু হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে কোনো সমস্যায় ভুক্তভোগীর নাম-ঠিকানা-অবস্থান নির্ধারণ করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কাজ করবে অটো কলার লোকেশন ট্র্যাকার। চলতি বছরের শেষ দিকে পুরোপুরি চালু হতে পারে এ সেবা। এতে সাড়া দেওয়ার সময় সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।

৯৯৯ নম্বরে জরুরি সেবা

২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর আবদুল গণি রোডে পুলিশের সেন্ট্রাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় জাতীয় জারুরি সেবা ৯৯৯ এর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। বিপদে-আপদে পুলিশি সেবা, ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিতে চালু হওয়া এ নম্বরটিতে মোবাইল ও ল্যান্ডফোন থেকে সম্পূর্ণ টোল-ফ্রি কল করে বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে সেবা নিতে পারে মানুষ।

আরও পড়ুন>> কলার লোকেশন ট্র্যাকার/৯৯৯-এ ফোন করে বলতে হবে না নাম-ঠিকানা-অবস্থান

৯৯৯ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর সেবাটি চালুর পর থেকে চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার কোটি ৮৪ লাখ আট হাজার ৭৬৪টি কল এসেছে। এর মধ্যে দুই কোটি তিন লাখ ২৮ হাজার ২৬৬টি কলার সেবা পেয়েছেন, যা মোট কলের ৪১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। একই সময়ে দুই কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ৪৯৮টি অপ্রয়োজনীয় কল এসেছে, যা মোট কলের ৫৮ দশমিক শূন্য এক শতাংশ। এর মধ্যে বিরক্তকর কলই ছিল ২৩ লাখ ৭৭ হাজার ১০টি। বর্তমানে প্রতিদিন ২২ থেকে ২৫ হাজার ফোন আসে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে।

ফোন করে কথা না বলা, অকারণে ফোন করা, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা, মিসড কল দেওয়াসহ অপ্রয়োজনীয় ফোন করা হয়। এসব নম্বরে ৯৯৯ থেকে সতর্ক করে পাঠানো হয় মেসেজ। এরপরও বারবার ফোন করে বিরক্ত করলে সেই নম্বর ব্লক লিস্ট করে রাখা হয়। বিরক্তিকর কল থেকে মুক্তি পেতে ২০২১ সালের ১ জুলাই এজন্য দণ্ডের বিধান রেখে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ এর ধারা ৭০ (১) সংশোধন করা হয়। এই আইনে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া কল দিলে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। এমনকি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও বিরক্তিকর কলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

সেবা দিতে বিড়ম্বনা

পারিবারিক নির্যাতন থেকে শুরু করে নানা ধরনের সেবা দিচ্ছে ৯৯৯। কলার লোকেশন ট্র্যাকার না থাকায় ৯৯৯-এ ফোন করলে প্রথমে গ্রাহক বা ভুক্তভোগীকে তার নাম, ঠিকানা বলতে হয়। অনেক সময় বিপদগ্রস্ত মানুষটি তার সঠিক অবস্থান জানাতে পারেন না। ফলে সেবাদানে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়।

আরও পড়ুন>> ৯৯৯-এ কল দিয়ে প্রাণে বাঁচলেন সাগরে ডুবতে থাকা ১৮ জেলে

চলতি বছরের ২৭ জুন রাতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে পাঁচটি ট্রলারে প্রায় আটশ ঈদযাত্রী গাইবান্ধার বালাসিঘাট যাচ্ছিলেন। রাতের অন্ধকারে ট্রলারগুলো পথ হারিয়ে দিকভ্রান্ত হলে রিপন নামে এক যাত্রী ৯৯৯-এ ফোন করে সহযোগিতা চান। কলটেকার কনস্টেবল মইনুল ইসলাম নৌ-পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও গাইবান্ধার বালাসিঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে বিষয়টি জানান। রিপন ট্রলারের অবস্থান বলতে না পারায় উদ্ধারকারী দল প্রথমে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে কলারের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে ব্রহ্মপুত্র নদের গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানাধীন কোচখালী এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করে।

৯৯৯-এর গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশিক্ষক পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, কলারের দ্রুত সেবা দিতে গিয়ে এখন আমাদের নাম, ঠিকানা, অবস্থান জানতে হয়। এতে অনেকে তার অবস্থান বলতে পারেন না। ফলে কোনো কোনো ঘটনায় আমাদের সেবা দিতে সময় লেগে যায়। কিন্তু আমাদের অটো কলার লোকেশন ট্র্যাকার থাকলে এ তথ্যগুলো নিতে হতো না।

শিগগির চালু হচ্ছে অটো কলার লোকেশন ট্র্যাকার

অটো কলার লোকেশন ট্র্যাকার যুক্ত হলে গ্রাহকের লোকেশন ও পরিচিতির সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যাবে ৯৯৯ এ। সময় নিয়ে গ্রাহকের নাম-ঠিকানা-অবস্থান বলতে হবে না। ফলে গ্রাহকের সময় বাঁচবে, অন্যদিকে আরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেবা দিতে পারবে ৯৯৯। এছাড়া বিরক্তিকর কল এড়াতেও কলার লোকেশন ট্র্যাকার কাজে আসবে।

আরও পড়ুন>> যৌন নির্যাতন-সহিংসতা/৯৯৯ এ প্রতিদিন আসছে অর্ধশতাধিক কল

এরই মধ্যে কলার লোকেশন ট্র্যাকার পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। শুরুতে কলার লোকেশনে ব্যক্তির নাম, ঠিকানা ও কোন জায়গা থেকে ফোন দিয়েছে ৯৯৯ এর গুগল ম্যাপে তা নির্দিষ্ট হবে। সিম রেজিস্ট্রেশনের ঠিকানা, নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর এখন পাওয়া যাচ্ছে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে কলারের লোকেশনও পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে গ্রামীণফোনের টুজি এবং থ্রিজি সিম নিয়ে কাজ করছে জাতীয় জরুরি সেবা। এরপর ফোরজি ও ফাইভজি নিয়ে কাজ করবে তারা। গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক বেশি বলেই শুরুতে এটা নিয়ে কাজ চলছে। জাগো নিউজকে ৯৯৯-এর এক কর্মকর্তা বলেন, অটো কলার লোকেশন ট্র্যাকার নিয়ে কাজ চলছে। আমরা গ্রামীণফোনের টুজি এবং থ্রিজি সিম নিয়ে কাজ করছি। গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক বেশি। এরপর আমরা অন্য অপারেটর নিয়ে কাজ করবো। এগুলো শিগগির সম্পন্ন হবে।

আনোয়ার সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশনার পরই ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) মোবাইল কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় জরুরি সেবার কাজে সহযোগিতা করার জন্য। এরপরই আমরা এখন চেষ্টা করছি গ্রামীনফোনের সিম নিয়ে। তারপর বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল এগুলোতে আর খুব বেশি সময় লাগবে না।

তিনি বলেন, এখন আমরা কলারের নাম-ঠিকানা তথ্য পেয়ে যাচ্ছি। লোকেশন কিছুটা পাচ্ছি, কিছুটা পাচ্ছি না। টেকনিক্যাল বিষয় যেহেতু এক মাস না তিন মাস লাগবে বলা যাচ্ছে না। কাজ শুরুর আগে আমরা ভেবেছিলাম হয়তো দ্রুতই এটা শুরু করা যাবে। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে একটার পর একটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

মোবাইল কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)। ৯৯৯-এর সেবাকে আরও সহজ ও দ্রুত দেওয়ার ক্ষেত্রে কলার লোকেশন ট্র্যাকার নিশ্চিত করা জরুরি। মোবাইল কোম্পানিগুলোকে সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কাজে সহযোগিতা করার জন্য মোবাইল কোম্পানিগুলোকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে।

আরএসএম/এএসএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।