কাশ্মির: নিখোঁজ রাজ্যের এক বছর

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:১৮ পিএম, ০৬ আগস্ট ২০২০

গত বছরের ৫ আগস্ট নরেন্দ্র মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা বাতিল করে এটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করেছিল। সেই জম্মু ও কাশ্মির নামের রাজ্যটি নিখোঁজ হওয়ার এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর সেখানে এখন কী পরিবর্তন এসেছে তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে ভারতজুড়ে, যদিও রামমন্দির নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনটিকে ঠিক কাশ্মিরের অধিকার হননের দিনে ফেলে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা ছিল সরকারের।

যেই সাংবিধানিক ধারা ৩৭০ এর বলে কাশ্মির আধা-স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো, হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার সেটি গত ৫ আগস্ট কেড়ে নিয়েছে শুধু তা নয়, বিতর্কিত এই পদক্ষেপের আগে কাশ্মিরের হাজার হাজার মানুষকে আটক করেছে। কাশ্মিরি রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি করেছে। এদের অনেকেই ভারতের নানা জায়গায় জেলে বন্দি এখনো। তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে গুরুতর সব অভিযোগ। হিউম্যান রাইটস ফোরামের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী লোকজনকে বিতর্কিত দুটি আইনের ধারায় জেলে ভরে দেওয়া হচ্ছে যে ধারায় কোনো জামিন নেই।

এর মধ্যে বিতর্কিত এক জননিরাপত্তা আইন, পাবলিক সেফটি অ্যাক্টে (পিএসএ)। এই আইনে কোনো অভিযোগ না এনেই যে কাউকে দুই বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়। চলমান ব্যাপক অভিযানে কত কাশ্মিরিকে আটক বা কারাবন্দি করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। গত বছরের ২০ নভেম্বর সরকার পার্লামেন্টে জানিয়েছিল, ৪ আগস্ট ২০১৯ তারিখ থেকে তারা মোট ৫ হাজার ১৬১ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের কতজনের বিরুদ্ধে পাবলিক সেফটি অ্যাক্টে অভিযোগ আনা হয়েছে বা কতজন এখনো বন্দি তা জানা যায়নি।

'নিখোঁজ' হওয়া কাশ্মিরিদের বাবা-মায়েরা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি নাগরিক সংগঠন। আদালতের যেসব নথি তারা সংগ্রহ করেছেন, তাতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে পাবলিক সেফটি অ্যাক্টে আটক কাশ্মিরিদের আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে মোট ৬৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১২টিই করা হয় ৫ আগস্টের পর।

এদিকে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের মধ্য দিয়ে জম্মু-কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার বাতিলের সিদ্ধান্তকে 'অবৈধ' বলে উল্লেখ করেছে চীন। বুধবার ৫ আগস্ট চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ধারাটি বাতিলের বর্ষপূর্তিতে এক প্রশ্নের জবাবে একথা জানিয়েছে। বেইজিং দাবি করে আসছে, ‘জম্মু-কাশ্মির নিয়ে একতরফা যে কোনো সিদ্ধান্ত অবৈধ ও অকার্যকর’। গত বছর বেশ কয়েকটি বিবৃতিতেও ভারতীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একই অবস্থান জানিয়ে আসছিল পাকিস্তানের মিত্র চীন। ভারত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চীনকে তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাথা না ঘামাতে বলেছে।

চীন খোদ নিজেই তার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার লংঘন করছে অভিযোগ থাকলেও গত বছর তারা কাশ্মির নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ এনেছিল।

পাকিস্তান অবশ্য আরও একধাপ এগিয়ে হাস্যকরভাবে ভারত অধিকৃত কাশ্মিরকে তার মানচিত্রে দেখাচ্ছে, যদিও সে নিজেই আজাদ কাশ্মির নামে কাশ্মিরের একাংশকে নিজেদের আয়ত্বে রেখে দিয়েছে। সেই মানচিত্রে জম্মু-কাশ্মির, লাদাখ এবং গুজরাটের জুনাগড়কে নিজেদের অংশ বলে দাবি করেছে পাকিস্তান সরকার। নতুন মানচিত্র প্রকাশের পরই দিনটিকে পাকিস্তানের ইতিহাসে সব থেকে ঐতিহাসিক দিন বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। অবশ্য পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক পাগলামো' বলে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন যখন হরণ করা হয়েছে তখন তাকে বিজেপি সমর্থকরা বলেছিল ‘মাস্টারস্ট্রোক; যেমনটা তারা নোট বাতিলের সময় মোদি সরকারের নীতির প্রশংসা করে বলেছে। সেই নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফল নিয়ে যেমন মোদি ভক্তরা কথা বলেন না ঠিক কাশ্মিরের অধিকার হরণ করা নিয়েও তারা বলছেন না এখন। ভারতীয় অধিকাংশ বিশ্লেষক, বিভিন্ন সংগঠন একমত যে, কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা বাতিল এবং রাজ্যকে দুই ভাগ করে কেন্দ্রের অধীনে নিয়ে আসাটা সেখানকার রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নে গত এক বছর কোনো কার্যকর ফল দেয়নি।

মোদি সরকার থেকে বলা হয়েছিল ৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে জম্মু ও কাশ্মিরের লোকজন ভারতের সঙ্গে আরও বেশি করে একাত্মতা বোধ করবে কিন্তু কার্যত দেখা গেল তাদের আরো বেশি বিচ্ছিন্নতায় পেয়েছে। জঙ্গিবাদী বলা হোক আর বিচ্ছিন্নতাবাদী হোক- তাদের রিক্রুটমেন্ট থামেনি বরং বেড়ে গেছে।

বলা হয়েছিল অন্য সব রাজ্যের মতো এ রাজ্যের লোকরাও সমান অধিকার পাবে কিন্তু আসলে তা তো হয়নি বরং গত এক বছর তারা গৃহবন্দি হয়ে আছে। অন্য রাজ্যের নাগরিকরা ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছে আর জম্মু-কাশ্মিরে গত আগস্ট থেকে কয়েক মাস ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। ইন্টারনেট যখন চালু হয়েছে তখন এটা চলছে টু-জি পরিষেবা, যা দিয়ে সেখানে নর্মাল কার্যক্রম চালানো কঠিন। ভারত সরকার এটা করছে এজন্যই যে কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যাতে পাকিস্তানের জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে পারে। কিন্তু ভারতীয়রাই দাবি করে তাদের জঙ্গি মদদ দেয় পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানে তো ইন্টারনেটের গতি কমেনি।

আসলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যোগাযোগের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে সাধারণ জনগণের, ছাত্রছাত্রীদের। কাশ্মিরে লকডাউন চালু করে ছাত্রছাত্রীদের এমনিতেই স্কুলবঞ্চিত করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন তারা ঘরে বন্দি কিন্তু করোনার লকডাউনে যখন স্কুল অনলাইনে চলে এসেছে তখন টু-জি দিয়ে তাদের পক্ষে অনলাইনে ক্লাস করাও সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে সরকার বলেছিল কাশ্মিরে নতুন প্রজন্মের শিক্ষা এবং চাকরি সুযোগ বাড়বে সেখানে ১০ লাখ ছাত্রছাত্রী অন্য রাজ্যের মতো শিক্ষা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত।

৫০ হাজার যুবকের কর্মসংস্থান হবে বলেছে, সে ওয়াদা পূরণ হয়নি। কাশ্মিরে বেকারত্ব আগে ছিল ১৬ শতাংশ, এখন লাখ লাখ ছেলে বেকার। কাশ্মিরের ব্যবসায়ী সংগঠনের মতে, গত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ হাজার কোটি রুপি লোকসান হয়েছে কাশ্মিরের যেটি এই জুলাইতে এসে হয়েছে ৪০ হাজার কোটি রুপি। ভালো কিছু হওয়া তো দূরের কথা কাশ্মিরের হস্তশিল্প, পর্যটন খাত এবং ইনফরমেশন টেকনোলজির ৯০ হাজার চাকরি হারিয়েছে।

গত অগাস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ কাশ্মির শাটডাউনে ৫ লাখ লোক কর্মসংস্থান হারিয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে পর্যটনখাতে, ৭৪ হাজারের বেশি লোক বেকার হয়ে পড়েছে। নয় হাজার কোটি রুপির ক্ষতি শুধু ট্যুরিজম সেক্টরে। ট্যুরিজমের পরিসংখ্যান যদি দেখা হয় তাহলে বলা যায় কাশ্মিরে পর্যটনখাতে আয় কমেছে ৮৬ শতাংশ।

ফোরাম অব হিউম্যান রাইটস গ্রুপ, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরাও সদস্য রয়েছেন, তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে কাশ্মিরের অর্থনীতি বা সামাজিক উন্নয়ন কোনোটারই ইনডেক্স বাড়েনি। উন্নয়নের যেটুকু সম্ভাবনা ছিল যদি লোকজনের হাতে ইন্টারনেট থাকত, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকত, ট্যুরিজম যদি ঠিকমতো চলতো- তাহলেও কিছুটা আশা করা যেত।

অন্যদিকে কাশ্মিরের মতো একই অবস্থা বিরাজ করছে লাদাখে। ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়ার পর তারা মনে করেছিল তারা উন্নয়নের দিকে যাবে, সরকার তাদের বিশেষ সুবিধা দেবে, তাদের পরিবেশ সংরক্ষণ করবে। উল্টো বাইরের লোক গিয়ে বসতবাড়ি করার সুযোগ পেলে পরিবেশের বিপর্যয় হবে এই ভয়ে আছে তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আর্টিকেল ৩৭০ তুলে দেওয়ার পর জম্মু-কাশ্মিরের লোকজনের সোশ্যাল এবং ইকোনমিক কন্ডিশন যা ছিল তা থেকে কি বেড়েছে? জম্মু-কাশ্মিরের লোকেরা আগে যে নাগরিক অধিকার ভোগ করত এখন সেটা কি বেড়েছে? জম্মু-কাশ্মিরের লোকেরা নিজেদের আলাদা ভাবতো, ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়ার পর তাদের মানসিক বিচ্ছিন্নতা আরও বেড়েছে নাকি তারা কেন্দ্রের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে? মানে নিজেদের কাশ্মিরি মনে করে নাকি এখন ভারতীয় মনে করে? সব কটি প্রশ্নের জবাব হচ্ছে- ‘না’।

তাহলে মোদির তালি বাজানো সিদ্ধান্তের পর কাশ্মিরের বা পুরো দেশের কী লাভ হলো! মাঝখানে উন্নয়ন আর জাতীয়তাবাদের প্রোপাগান্ডায় জনগণ ভুলে গেছে কাশ্মিরের জনগণের মানবাধিকার, শিশুদের মানবাধিকার লংঘনের কথা। তাদের নিজ গৃহবন্দি করে রাখার কথা। হাজার হাজার মানুষকে বিনা কারণে জেলে দেওয়ার কথা। গত চার মাস ভারতীয়রা করোনার লকডাউন সহ্য করতে পারছে না, কাশ্মিরের জনগণ তাহলে কীভাবে এক বছর ধরে লকডাউন সহ্য করে আসছে- তাও আবার কয়েক মাস পুরোপুরি ইন্টারনেট ছাড়া এবং বর্তমানে অন্যান্য রাজ্যের মতো ইন্টারনেট সেবা বঞ্চিত হয়ে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]