ইতিহাসের শাস্ত্রীয় বচন বাঙালি বীর বাঙালি অকৃতজ্ঞ!


প্রকাশিত: ০৬:২৯ এএম, ১৬ জুন ২০১৫

ক্রিকেট ইতিহাসে তিনি অনেক ভাবে জড়িয়ে আছেন। ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য।‘মিনি বিশ্বকাপ’- খ্যাত বেনসন এন্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজের ‘চ্যাম্পিয়ন অফ চ্যাম্পিয়নস’। আশির দশকে ভিভিয়ান রিচাডর্সের সেই প্রায় অপ্রতিরোধ্য ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটা মাত্র টেস্টে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবং সেই টেস্টে জয়ী দলটার অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তবে তাঁর এসব কৃতিত্ব এখন ইতিহাসের পাতায়।

বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে চেনে দারুণ এক ক্রিকেট কমেন্ট্রেটর হিসেবে। সোজা কথা সোজা বলতেই যিনি ভালবাসেন। ক্রিকেট ইতিহাসের ঘূর্ণি পিচেও সোজা কথা বলার জন্য তিনি বিখ্যাত। সেই তিনি হঠাৎ করে বাংলাদেশের গৌরবময় এবং স্তব্ধ করে দেয়ার মতো বেদনাদায়ক ইতিহাসের মুখোমুখি হলেন!

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ইতিহাস মনস্ক ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত  মাইকেল আথারটন। যিনি ভারত-ইংল্যান্ড সিরিজের কমেন্ট্রি করার জন্য সিরিজ শুরুর দিন কয়েক আগে আসার কথা ভাবেন। ভারতের ইতিহাসটা জানা আর সে দেশের মানুষের জীবনটাকে ভালমতো বোঝার জন্য ঘুরতে চান কোলকাতার ফুটপাত ধরে! স্বাদ নিতে চান স্ট্রিটফুডের! সেই মাইকেল আথারটনকেও ইতিহাস মনস্কতায় যিনি টেক্কা দিতে চাইলেন তাঁর নাম রবি শঙ্কর শাস্ত্রী। ক্রিকেট বিশ্ব যাকে চেনে রবি শাস্ত্রী হিসেবে। গত সাতাশ বছরে কম করে হলেও সাতাশ বার বাংলাদেশে এসেছেন। এবার এসেছেন ভারতের টিম ডিরেক্টর হিসেবে। একটু অন্যরকম ভূমিকায়। আর সেই ভূমিকায় এসে নিজেকেও দাঁড় করালেন অন্যরকম ইতিহাসের মুখোমুখি!

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস কিংবা ক্রীড়া ইতিহাস সংরক্ষণে নেই কোনো ‘ক্রিকেট জাদুঘর অথবা ‘ক্রীড়া জাদুঘর’! থাকলে হয়তো সেখানে রবি শাস্ত্রী একবার ঢু মারতেন। অ্যাডিলেডে ব্র্যাডম্যান কালেকশনস, বাউরালে ব্র্যাডম্যান জাদুঘর অথবা এমসিজিতে স্পোর্টস মিউজিয়ামে বহুবার তিনি গেছেন। কিন্তু এবার বাংলাদেশে এসে গেলেন ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট কভার করতে এসে যে বত্রিশ নম্বর দেখে গিয়ে সেই সময় ক্রিকইনফোর এক ব্রিটিশ সাংবাদিক লিখেছেলিন, ‘বত্রিশ নম্বর, ওটাই বাংলাদেশের ঠিকানা!’ এবার সেই ঠিকানায় পা রাখলেন রবি শাস্ত্রী। তারপর তিনি লিখে রেখে গেলেন;‘ প্রথম বার আমার এখানে আসা। ফিরছি অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। এখানকার সবকিছু হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। বুঝলাম কেন তিনি সব সময়  গ্রেট ম্যান। বাংলাদেশে যারা আসবেন তাদের একবার এটা দেখে যাওয়া উচিত।’

কি দেখলেন শাস্ত্রী বত্রিশ নম্বরে? উত্তরে শুধু বলা যায়; দেখে গেলেন বাংলাদেশকে। দেখে গেলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস। দেখলেন বাংলাদেশের শৈশবের রক্তাত্ত ইতিহাসও! যে ইতিহাস কাঠিন্যেমোড়া রবি শাস্ত্রীর মতো মানুষকেও বিষণ্ণ করে তুললো! স্তব্ধ করে দিলো। আবেগ তাড়িত  করলো। বত্রিশ নম্বরের রক্তমাখা সিঁড়ির সামনে থমকে দাঁড়ালেন তিনি! অস্ফুটস্বরে বললেন; ‘এটা কিভাবে সম্ভব!’ বত্রিশ নম্বরের বাড়ির দেয়ালে বুলেটের ক্ষত। তা দেখে  হয়তো খানিকটা ক্ষত-বিক্ষত মনে হলো শাস্ত্রীর হৃদয়ও। ‘খুনিরা এখানেই বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছিল!’ সেই সিঁড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু ভবনের প্রতিটি রুম যা বাঙালি জাতির বেদনা আর কলঙ্কের স্মৃতি বুকে নিয়ে আছে, তা ঘুরে দেখলেন শাস্ত্রী। দেখালেন তাঁর সঙ্গে থাকা ভারতীয় দলের সাপোর্ট স্টাফ সাবেক ক্রিকেটার সঞ্জয় বাঙ্গার, ভরত অরুণকে। ঐ বাড়ির দেয়ালে ঝুলানে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখতে দেখতে তাঁর চোখ আটকে গেলো একাধিক ছবিতে।

ভারতীয় দলের ম্যানেজার কোলকাতার এক বাঙালী বিশ্ব রূপ দে-কে ডেকে দেখালেন সাদ্দাম-গাদ্দাফি’র সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবি। অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে গেলেন একই ফ্রেমে বঙ্গবন্ধু আর ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে দেখে। এবার অন্যরকম এক শাস্ত্রী। বিষাদাচ্ছন্ন শাস্ত্রী যেন হালকা হতে চাইলেন অন্যরকম এক শাস্ত্রীয় বচনে; ‘একজনের পাইপ আরেক জনের সিগারেট। জমে যেতো নিশ্চয়ই!’

ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কিউরেটর শাস্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন ক্যাস্ট্রোর সেই ঐতিহাসিক উক্তি; ‘আমি হিমালয় দেখিনি। শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ শাস্ত্রীর প্রশ্ন ছিল; হিমালয় কেন? বঙ্গবন্ধু কতো উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন, সেটা বোঝাতেই ক্যাস্ট্রো হিমালয়কে টেনে এনেছিলেন। সেটাও জেনে গেলেন রবি শাস্ত্রী। জেনে গেলেন ’৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা তাঁকে গ্রেপ্তার করার আগে কিভাবে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা কিভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল। কিভাবে  এদেশের নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছিল পাকসেনারা।

ইতিহাসের পাতা উল্টানোর মতো এক একটা ছবি দেখে জেনে গেলেন,  গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া থেকে উঠে আসা একটা লোক কোলকাতায় পড়াশোনা করার সময় গান্ধী, সোহরাওয়ার্দী-র সংশর্স্প পেয়ে একজন ছাত্র নেতা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে একটা রাষ্ট্রের জন্ম দিলেন কিভাবে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, বেকার হোস্টেলের ছবি দেখতে দেখতে শাস্ত্রীর মন্তব্য; ‘তার মানে কোলকাতার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ছিল পুরনো।’বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতিটি দফা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তিন নম্বর দফা যেখানে পূর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভিন্ন অথচ বিনিময়যোগ্য মুদ্রার কথা বলা হয়েছিল, সেটা পড়ে রবি শাস্ত্রী বলেই ফেললেন; ‘ওটা হলে ইতিহাসটা বোধহয় অন্যরকম হতো।’

বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজবেন আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাদ যাবে তা কি করে হয়! ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিওটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। শুনলেন। চোখ রাখলেন পর্দার নিচে সাব টাইটেলে। শাস্ত্রীরও বুঝতে বাকি থাকলো না ঐ ভাষণটাকে কেন ‘রাজনৈতিক কাব্য’ বলা হয়। কেন শেখ মুজিবকে রাজনীতির কবি বলা হয়। যে কবির জীবন শেষ হয়েছে বিশ্বাসঘাতকদের বুলেটে।

বত্রিশ নম্বরে শাস্ত্রী দেখলেন ফ্রেমবন্দী এক ‘স্টুডেন্ট লিডার-কেও। পরবর্তীতে যাকে বহুবার দেখেছেন। দেখেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। জানলেন ১৫ আগস্টে কিভাবে বেঁচে গিয়েছেন তিনি এবং তাঁর বোন। জানলেন কি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তিন ভাইকে। অথচ তাঁর জানা হলো না এবং জানানো হলো না এই বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রীড়াইতিহাসেরও অনেক ঘটনা।

বাংলাদেশে কোনোদিন যদি ক্রীড়া জাদুঘর তৈরি হয়, তাহলে এ বাড়িরও কিছু কিছু জিনিস সেখানে জায়গা পাওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধু শুধু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী-ই ছিলেন না। ছিলেন অসম্ভব ক্রীড়াপ্রেমী। আর এই বাড়িটায় ছিল ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের অবাধ যাতায়াত। সেই বাড়িটার অনেক কিছু দেখলেন সাবেক ক্রিকেটার রবি শাস্ত্রী। দেখলেন ঐ বাড়ির দোতলার একটা ঘরে সংরক্ষিত আছে পুরনো একটা ক্রিকেট বল। অন্য ঘরে আছে গোটা চারেক ক্রিকেট ব্যাট।

শাস্ত্রী জানলেন না, এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন ক্রিকেটারের অনেক স্মৃতি। যিনি ক্রিকেট খেলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে। খেলেছেন উদিতি, আবাহনীর মতো ক্লাবের হয়ে। যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবাহনীর মতো জনপ্রিয় ক্লাবের। এবং যিনি প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাসী ছিলেন ক্রিকেট নামক খেলাটার স্পিরিটে। তাই আবাহনীর হয়ে একটা লিগ ম্যাচ খেলার সময় অধিনায়ক আলিউল ইসলাম  দু’ওভার বল করিয়ে-ই তাঁকে যখন বলেছিলেন; ‘যাও টুয়েলভম্যানকে মাঠে পাঠাও, ম্যাচ ফিটনেসে ঘাটতি থাকলে মাঠে নামা ঠিক না।’ ক্যাপ্টেনের কথাই শেষ কথা মেনে নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল। এই বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রথম শহীদও সেই শেখ কামাল। তাঁর জীবনের ইনিংসটা শেষ হলো রক্তাক্ত বত্রিশে! এখনো সেখানে পড়ে আছে তাঁর ব্যাট-বল।

রবি শাস্ত্রী ভারতের সাবেক ক্রিকেটার। বর্তমান টিম ডিরেক্টর। বাংলাদেশকে ভাল করে চিনতে আর জানতে গিয়ে ফুল দিয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে। কিন্তু যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ দলের ব্লেজার উঠতো না যাদের গায়ে; বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে কিংবা বিশ্বকাপ খেলে এসে যারা গণসংবর্ধনা পান তাঁরা কি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে একটু শ্রদ্ধা জানাতে পারেন না! ক্রিকেট শুধু একটা খেলা নয়। একটা জাতিকেও চেনা যায় তার মধ্য দিয়ে। বত্রিশ নম্বর বাংলাদেশ এবং বীর বাঙালি জাতির যেমন ঠিকানা, তেমনি অকৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির কথাও মনে করিয়ে দেয়। কোনো বিদেশী বত্রিশ নম্বরে গেলে, তাঁর মনের অজান্তে শাস্ত্রীয় বচনের মতো উচ্চারিত হতেই পারে। বাঙালি বীর। বাঙালি অকৃতজ্ঞ!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ইনজুরি টাইম’ ‘এক্সট্রা টাইম’ ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। তিনি কাজ করেছেন দেশের নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন দৈনিকে, টেলিভিশন এবং দেশি-বিদেশি রেডিওতে।

এইচআর/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।