এক চিঠি নিয়ে একমাস পর হেফাজতে তোলপাড়!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ পিএম, ০৬ আগস্ট ২০২২

নিজেদের ফোরামে আলোচনা না করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আট দফা সুপারিশ জানিয়ে চিঠি লিখেছেন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় চলছে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটিতে। এ বিষয়ে কথা বলতে মিজানুর রহমানকে ফোন ও মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি উত্তর দেননি। তবে হেফাজতে ইসলাম বলছে, চিঠির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

জানা গেছে, গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি চিঠি দেন অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান। ‘কওমি ধারার দ্বীনি শিক্ষা ও শিক্ষকের মান উন্নয়নকল্পে সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ’ শীর্ষক চিঠিতে মিজানুর রহমান ৮টি সুপারিশ করেন।

ওই চিঠির সূত্র ধরে আগামী ১০ আগস্ট বৈঠক ডেকেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে আট দফা সুপারিশের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলেও জানানো হয়। গত ৪ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কওমি মাদরাসার বোর্ড প্রধানদের একটি বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকের খবর শুনেই তোলপাড় শুরু হয়েছে হেফাজত নেতাদের মধ্যে।

এ নিয়ে শনিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেন সংগঠনটির নেতারা। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানের চিঠিটি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। ওই চিঠিতে মিজানুর রহমান লিখেছেন, ‘মহান আল্লাহ তায়ালার তওফিকে আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ ও জাতির ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। আপনার পিতা ও স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান একটি স্বাধীন-সর্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছেন। তারই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আপনি দেশকে উন্নয়নশীল থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় অঙ্গনে মুসলিম জাতি সত্ত্বার অস্তিত্ব ও ও ভিত্তি রক্ষায় আপনার অবদান জাতি যুগ যুগ ধরে স্বরণ করবে এবং জনগণ এর সুফল ভোগ করবে।’

চিঠিতে যেসব সুপারিশ করেছেন তিনি সেগুলো হলো-
১. কওমি ধারার দ্বীনি শিক্ষার মানোন্নয়নে আপনি (প্রধানমন্ত্রী) দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মর্যাদা দিয়ে সনদের ব্যবস্থা করেছেন এবং এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য জাতি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। ওই আইনে কওমি শিক্ষার সূচনা অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের ভিত্তি উল্লেখ নেই, সাধারণ শিক্ষায় যেমনটি আছে। কওমি শিক্ষা আইনে এই বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাটি ভবিষ্যতে অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশে অধীন ‘কওমি মাদরাসা সমূহের দাওরায়ে হাদিসের (তাকর্মীল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিস ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮' এর ২(১) ধারায় কওমি মাদরাসার সংজ্ঞায় ‘কওমি মাদরাসা’ অর্থ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত ও দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, মুলনীতি ও মত-পথের অনুসরণে মুসলিম জনসাধারণের আর্থিক সহায়তার উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত ইলমে ওহির শিক্ষাকেন্দ্র বলা হয়েছে। ওই ধারার সঙ্গে ‘যেখানে মক্তব, নাজেরা, হেফজ থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত এবং এরপরর ইফতা, উলুমুল হাদিস, তাফসিরসহ উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হয়’ সংযুক্ত করা আবশ্যক।

২. কওমি ধারার শিক্ষা একটি বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থা। এর শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিটি শিক্ষকের বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। জাতীয়ভাবে বা ব্যক্তি উদ্যোগে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’প্রতিষ্ঠা করা খুবই প্রয়োজন।

৩. যেহেতু কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আর্থিক সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে, সে কারণে মাদরাসার সব ধরনের দান আয়করমুক্ত থাকা দরকার। এই বিষয়ে পরিপত্র জারি করলে দাতারা উৎসাহের সঙ্গে কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করবেন।

৪. মাদরাসার নিজস্ব আয় থেকে শিক্ষক কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন, স্বল্প আয়ের শিক্ষকদের মাসিক বেতন নিয়মিত পরিশোধ করা, মেধাবী, এতিম, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান।

৬. কোনো সরকার প্রধানের উদ্যোগে একই সঙ্গে ৪৬০টি উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ একটি বিশ্ব রেকর্ড। এসব মসজিদে ইমাম ও খতিব নিয়োগের ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসা থেকে পাস করা মেধাবী আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদার অনুসারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিয়োগ বোর্ডে স্থানীয় কওমি মাদরাসা থেকে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা, যেন ভিন্ন মতাদর্শীরা নিয়োগ পেতে না পারেন। তাহলে সরকারের প্রদত্ত স্বীকৃতি বাস্তবে আরও প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

৬. কওমি শিক্ষাঙ্গন এবং সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষক, কর্মচারীদের সব ধরনের প্রচলিত রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

৭. সব কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেফাক ও হাইয়াতুল উলইয়ার আওতাভুক্ত করে তার নীতিমালার আলোকে পরিচালনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মাধ্যমে যেন ছাত্রদের পড়ালেখার মান নিশ্চিত করা যায়।

৮. ওপরের বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে এবং প্রতিটি কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখলে ব্যক্তি ও জাতি গঠনে কওমি মাদরাসাগুলো অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, মাদক নির্মূল ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে তৃণমূল পর্যায়ে মাদরাসাগুলোতে ওলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ বিষয়ে হেফাজত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চিঠির বিষয়ে তারা জানতেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের খবরের পর তারা বিষয়টি জেনেছেন। এ বিষয়ে মিজানুর রহমান হেফাজতের সিনিয়র নেতাদের অনুমতি নেননি বলে সংগঠনটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন। তবে চিঠির বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি কেউ।

বিষয়টি নিয়ে শনিবার দুপুরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে হেফাজত। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ রাব্বানী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো চিঠি অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর ব্যক্তিগত, এটি হেফাজতের নয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে আমিরে হেফাজত আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, সিনিয়র নায়েবে আমির আল্লামা মুহাম্মাদ ইয়াহহিয়া, মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, 'কওমি ধারার দ্বীনি শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানোন্নয়নে সদয় দৃষ্টি কামনা' শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে লিখিত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর একটি চিঠি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এটি হেফাজতের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো চিঠি নয়। চিঠির বিষয়টি হেফাজতের কোনো ফোরামে আলোচনা হয়নি। এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত। এই বিষয়ে অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী আমিরে হেফাজত আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, সিনিয়র নায়েবে আমির আল্লামা মুহাম্মাদ ইয়াহহিয়া ও আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীসহ কারও সঙ্গে আলাপ করেননি। গণমাধ্যমের বরাতে বিষয়টি জানতে পেরেছে হেফাজত নেতারা।

প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিটি হেফাজতের চিঠি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এটি একান্তই অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরীর চিঠি। এর সঙ্গে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

এসএম/কেএসআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]