বাবা নিজের জীবন বাজি রেখে শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছেন: শাহানা হানিফ

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ পিএম, ২১ আগস্ট ২০২২

অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। ছিলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিবের। ছয় দফা মুক্তি সনদ প্রণয়ন ও প্রচার, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সব আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে প্রথম কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হানিফ।

তার নেতৃত্বেই ১৯৯৬-এর মার্চে ‘জনতার মঞ্চ’ গঠিত হয়, যা ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং সরকার গঠনের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সময় নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানবঢাল তৈরি করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন মোহাম্মদ হানিফ। তবে গ্রেনেডে মারাত্মক আহত হন তিনি। তার মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য স্প্লিন্টার ঢুকে পড়ে। ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর ৬২ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

রোববার (২১ আগস্ট) গ্রেনেড হামলার ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই শোকের দিন এবং মেয়র মোহাম্মদ হানিফের স্মৃতিচারণ করেছেন তার কনিষ্ঠ কন্যা শাহানা হানিফ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মুসা আহমেদ।

জাগো নিউজ: কেমন আছেন?

শাহানা হানিফ: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

জাগো নিউজ: প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে নিয়ে আপনার স্মৃতি…

শাহানা হানিফ: আমার বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে শেষ করার কিছু নেই। আমার বাবা ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তার আদর্শ, কর্ম, গুণ, সহানুভূতি বা ভালোবাসায় আজও মানুষের মাঝে বেঁচে আছেন। স্মৃতি বলতে আমি বুঝি, যাকে ভোলা যায়, কিন্তু আমি তো বাবাকে ভুলতে পারি না। প্রতিটা পদে, মুহূর্তে, কাজে বাবার কথা মনে হয়। বাবাকে যতটুকু ভাবি বা এখন যতটুকু বুঝতে শিখেছি, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। বাবাকে যতটুকু জানতে পারছি, এখন মনে হচ্ছে বাবাকে পেলে হয়তো বা জিজ্ঞাস করতাম, ‘বাবা তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা।’ কিন্তু এটা বলতে পারিনি বাবাকে।

‘বাবার সঙ্গে যখন দেশের বাইরে যেতাম, সেই স্মৃতিগুলো বেশি মনে পড়ে। যেহেতু আমি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নই, তাই বাবার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা হতো না। ভাইয়ের (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন) সঙ্গেই রাজনীতি নিয়ে বাবা বেশি আলাপ-আলোচনা করতেন। তবে ভাইয়ার সঙ্গে যখন কথা বলতো, সেগুলো শুনতাম। কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না। আমি পারিবারিক বিষয় নিয়ে ডিসকাস করতাম। বাবা সব সময় বলতেন কীভাবে চলতে হবে, কী করতে হবে।

১৯৯৪ সালে বাবা যখন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলেন তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। মেয়র পদে শপথ নিয়ে বাবা বাসায় ফেরার পর আমাকে এবং ভাইকে কিছু কথা বলেন, যেগুলো এখনো আমাদের খুব মনে পড়ে, দাগ কাটে। তখন বাবা বলেছিলেন, দেখো আমি এখন একটা পজিশনে আসছি আল্লাহর রহমতে। তোমরা কখনোই এগুলো নিয়ে মনের ভেতর অহঙ্কার করবে না। স্বাভাবিকভাবে সবার সঙ্গে কথা বলবা, চলবা। স্কুলে সবার সঙ্গে সুন্দরমতো থাকবে। স্যারার যে পরামর্শ দেয়, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং ফলো করবে।

জাগো নিউজ: ২১ আগস্টের ঘটনার দিন কোথায় ছিলেন, বাবার দুর্ঘটনার খবর কীভাবে পেলেন?

শাহানা হানিফ: গ্রেনেড হামলার পর ঘটনাটা যতটুকু মনে পড়ে, আমি তখন একটা হাসপাতালে ডেন্টিস্টের কাছে ছিলাম। ঘটনা শুনে সেখান থেকে সরাসরি শাহবাগে বারডেম হাসপাতালে চলে যাই। শত শত মানুষের ভীড়ে হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে গাড়ি থেকে নেমে যাই। গাড়িটা হাসপাতাল পর্যন্ত যাবে সেই অপেক্ষা করিনি। সেখানে গিয়ে দেখি একদিকে আমার বাবা, আরেক দিকে ভাই (সাঈদ খোকন)। ওই ধরনের পরিস্থিতি আমি আগে কখনো দেখিনি। তখন জানি না কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। কিন্তু যতটুকু দেখলাম, যতটুকু বুঝলাম এটা কারও নেওয়ার মতো না। একদিকে বাবার হাত থেকে রক্ত ঝরছে, মাথায় ব্যান্ডেজ, রক্তাক্ত শরীর। আরেক দিকে ভাইয়ের হাতে, মাথায়, পায়ে ব্যান্ডেজ।

জাগো নিউজ: বাবার শেষ সময়গুলো কেমন ছিল?

শাহানা হানিফ: ২১ আগস্টে একের পর এক ছোড়া গ্রেনেডে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রাণে রক্ষা পেলেও মারাত্মক আহত হন বাবা। তার মস্তিষ্কসহ দেহের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য স্প্লিন্টার ঢুকে পড়ে। দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করেই মোহাম্মদ হানিফ জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীসময়ে ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তাঙ্গণে সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে সভাপতির বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে ওই বছরের ২৮ নভেম্বর ৬২ বছর বয়সে মারা যান।

‘বাবার শেষ সময়গুলো খুবই দুঃখের, কষ্টের ছিল। শুধু বাবার সামনে যেতাম, দেখতাম। কিন্তু কথা বলতে পারতাম না। বাবারও কথা বলার পরিস্থিতি ছিল না। শুধু মনে হতো, বাবা যদি শুধু একটা বারের জন্য ডাকতো। একটা কথা যদি শুনতে পারতাম।’

‘স্প্লিন্টারের আঘাতের পর বাবার সঠিক চিকিৎসা হয়নি। হাসপাতালে এমআরআই, সিটি স্ক্যান ঠিকমতো হয়নি। তখন খুব আফসোস হয়েছিল, বাবার যদি সঠিক চিকিৎসা করাতে পারতাম। তা হলে হয়তো বাবা সুস্থ হয়ে যেত। এই কষ্টটা সারাজীবন মনের মধ্যে রয়েই গেলো।’

জাগো নিউজ: ২১ আগস্টের ঘটনা আপনার এবং আপনার পরিবারে কী প্রভাব ফেলেছে?

শাহানা হানিফ: প্রভাবতো অবশ্যই পড়ছে। বাবার তখন বয়স ৬২ বছর ছিল। এটাতো নরমাল মুত্যুর সময় না। এটা অ্যাক্সিডেন্টের মতো হয়ে গেলো। তখন পুরো পরিবারের হাল ধরেছেন আমার একমাত্র ভাই সাঈদ খোকন। তিনি সবাইকে দেখাশোনা করেছেন। প্রতিটা মুহূর্তে মা এবং বাচ্চাদের আগলে রেখেছেন। সেই সময়টা আসলে ভুলতে পারি না। আল্লার ইচ্ছায় সব কিছু হয়েছে।

জাগো নিউজ: গ্রেনেড হামলার বিচার হয়েছে। তবে অনেকের রায় কার্যকর বাকি। তারা বিদেশে পলাতক রয়েছেন। এই রায়ে আপনি সন্তুষ্ট কি না?

শাহানা হানিফ: আমরা যতটুকু হারানোর, ততটুকু হারিয়ে ফেলেছি। এখন যারা ওই ঘটনায় পলাতক আছে, আমি চাই তাদের দ্রুত সময়ে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হোক। এতটুকুই আমার চাওয়া।

জাগো নিউজ: ২১ আগস্টের একজন আত্মোৎসর্গকারীর সন্তান হিসেবে রাজনীতিবিদদের প্রতি আপনার কোনো চাওয়া আছে?

শাহানা হানিফ: ওইদিন আমার বাবা নিজের জীবন যেভাবে বাজি রেখে তার প্রাণপ্রিয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছিলেন, আমি চাই আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মী মেয়র মোহাম্মদ হানিফের আদর্শ অনুসরণ করুক। এখন যেমন একটা পরিস্থিতি যাচ্ছে, সে পরিস্থিতিতে প্রতিটি নেতাকর্মীকে আমার বাবার বিসর্জন, আত্মত্যাগের কথা মনে করে তার নেত্রীর পাশে থাকবে, এটাই আমি চাই।

জাগো নিউজ: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শাহানা হানিফ: জাগো নিউজকেও ধন্যবাদ।

এমএমএ/এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।