বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ভারতমুক্ত হয়নি
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছিলাম আত্মমর্যাদা, বিজয় এবং রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পর আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে-আমরা কি বাস্তবে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পেরেছি। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আবেগে নয়; এটি দাবি করে গভীর রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং সামাজিক বিশ্লেষণ।
স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা ছিল বাস্তব এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন নিজস্ব রাষ্ট্রনীতি ও কৌশল নির্ধারণে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন রাজনৈতিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং নেতৃত্বের বিভাজন সেই প্রচেষ্টাকে বারবার সীমিত করেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর অনেকটাই ধারাবাহিকভাবে কার্যকর করা যায়নি। প্রশাসনিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক চাপ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা নীতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবের ফল ছিল না; দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার চক্র এবং নীতি সংকটই স্বাধীনতার পূর্ণতা অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একক শাসনব্যবস্থা, বিরোধী মত দমনের প্রবণতা এবং দলীয় সংগঠনের দুর্বলতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরে বাংলাদেশের রাজনীতি বিকশিত হয়েছে জেনারেল জিয়া, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। জেনারেল জিয়া সামরিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে দলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক করেন, যা রাজনীতিকে আরও বিভক্ত করে তোলে।
এরশাদের দীর্ঘ সামরিক শাসন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থবির করে দেয়। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সমাজের গভীর বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ সময়ের শাসন অনেক বিশ্লেষকের কাছে একদিকে দূরদর্শী অন্যদিকে স্বৈরাচারী হিসেবে বিবেচিত। এই নেতৃত্ব কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এনেছে। তবে এর মূল্য ছিল উচ্চ। নির্বাচন ব্যবস্থা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সংবিধান এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব বেড়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে। এর ফলে দেশের স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণের জায়গা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক স্বাধীনতার পর থেকেই জটিল। দীর্ঘমেয়াদি কেন্দ্রীভূত শাসন এবং স্বৈরাচারী প্রবণতা রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করেছে। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ক্ষীণ হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং স্বাধীন নীতি প্রয়োগের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। এটি সরাসরি কোনো দখল নয়; বরং শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ এবং নীতিগত স্বাধীনতার অভাব বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে নেতৃত্বের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়। ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দমন করা হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। এর চূড়ান্ত ফল হলো রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সংকোচন, আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের ক্ষতি, গণতান্ত্রিক সংস্কারের ব্যাঘাত এবং ভারতের প্রভাব বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি।
ভারত মুক্ত হতে বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো শত্রুতা নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের ভেতরের শক্তি পুনর্গঠন। একটি দেশ তখনই অন্য দেশের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়, যখন তার নেতৃত্ব স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির নয় রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে এবং তার গণতান্ত্রিক কাঠামো জনগণের বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর প্রভাব অনিবার্যভাবেই জায়গা করে নেবে।
ভারত মুক্ত হওয়া মানে সীমান্ত বন্ধ করা নয় বা সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; ভারত মুক্ত হওয়া মানে জাতীয় স্বার্থকে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে নেওয়া, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখা এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেখানে ক্ষমতা নয় জবাবদিহি মুখ্য। বাংলাদেশ যদি নিজেই শক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, তাহলে কোনো দেশই তাকে জিম্মি করে রাখতে পারবে না।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণআন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষা ও কোটা সংস্কার, বৈষম্যহীন সুযোগ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের বাস্তবায়ন। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক লাখ মানুষ এতে অংশ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। দেশের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষের অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে কেবল একটি দাবি ভিত্তিক আন্দোলন নয়; বরং দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশে রূপ দেয়।
তীব্র গণচাপ সত্ত্বেও আন্দোলনটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক রূপ নিতে পারেনি। রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্তহীনতা, সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ এবং সংবাদ ও তথ্যপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণ এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এর ফলে আন্দোলনের প্রাথমিক ঐক্য ভেঙে পড়ে এবং কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও নৈতিক, সাংগঠনিক এবং সমন্বিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হওয়ায় কার্যকর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ সংকুচিত হয়েছে। স্বাধীনতার আদর্শ আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। তবে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবে বিপ্লবী সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়নি। এটি কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কার এবং সমন্বিত নেতৃত্বের অভাবের প্রতিফলন।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো সব রাজনৈতিক দলের নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং জনগণভিত্তিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সীমিত করা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ পুনর্জাগ্রত করাই পারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব ভিত্তি তৈরি করতে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক স্বাধীনতার পূর্ণ বাস্তবতা এখনো সংগ্রামের মধ্যেই রয়েছে। মূল সংকট বাহ্যিক কোনো রাষ্ট্র নয়। সংকট নিহিত রয়েছে নেতৃত্বের দুর্বলতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সমন্বয়ের অভাব এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের ব্যর্থতায়। দুই হাজার চব্বিশ থেকে পঁচিশ সালের গণআন্দোলন কোনো বিদেশি প্রভাবের ফল নয়। এটি জনগণের আত্মস্বীকৃতি, অসন্তোষ এবং নেতৃত্ব পুনর্গঠনের দাবির বহিঃপ্রকাশ। এই সংকটই বাংলাদেশকে একটি জনগণভিত্তিক, নীতিগত এবং স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে আজও বাধা দিচ্ছে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম/জেআইএম