‘ভাইরাল’ হওয়ার মানসিকতা বিপর্যয়ের শামিল
গোলাম রববানী
‘ভাইরাল’ শব্দটি এখন বিশ্বজুড়ে অতিপরিচিত শব্দ। বেশ সমাদৃত। আগেও পরিচিত ছিল কিন্তু বর্তমানের মতো নয়। কোনো ছবি, অডিও, ভিডিও, তথ্য ইত্যাদি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে খুব দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বলা যায়, এটি দ্রুত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি বিজ্ঞাপন প্রচারণা। যখন ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং কোটি কোটি মানুষ তা দেখেন। ভাইরাস যেভাবে মানবদেহে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়; সেভাবে অনলাইন মার্কেটিংয়ে ভাইরাল কনটেন্টের উত্থান।
২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক চালু হয়। তবে এর অর্ধযুগ পরে অর্থাৎ ২০১০ সালের পর থেকে ভাইরাল শব্দটি বিশ্বব্যাপী বেশি জনপ্রিয়তা পায়। হোক ভালো কিংবা মন্দ ঘটনা, তা দ্রুত বিস্তার ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার বা লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছায়। শেয়ারিং একটা বড় ব্যাপার; ফেসবুক ব্যবহারকারীরা যখন ভিডিও বা পোস্টটি অন্যদের সাথে শেয়ার করেন; তখন স্নো বলের মতো রূপান্তর বা বিস্তরণ ঘটে। এভাবেই ভাইরাল হওয়া ব্যক্তি বা বস্তু বা ঘটনা জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। এরপর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি ছড়াতে থাকে।
‘ভাইরাল’ শব্দটি নেহাতই সুখকর কোনো ব্যাপার নয়। তারপরও স্বীকার করছি ভাইরাল হওয়া দরকার। ভালো কাজের কল্যাণে। কিন্তু এটা যতটা না স্বস্তির; তারচেয়ে ভয়, লজ্জা, অসম্মান এবং আতঙ্কের কারণ। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ভাইরালকে দিয়েছে ইতিবাচক ভাবমূর্তির চেয়ে নেতিবাচক ভাবমূর্তির গুঞ্জন। মাদকাসক্তির চেয়ে বড় আসক্তি বা নেশার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভাইরাল’। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ আজকাল ভাইরাল হতে উদগ্রীব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ভাইরাল সংক্রমণের উদাহরণ হতে পারেন। তার শিশুসুলভ আচরণ পেশা আর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একদমই যায় না। তার পোস্টের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যেও অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। নিজে তো অসম্মানিত হচ্ছেন, অন্যকেও অসম্মান করছেন। কেউ তার বই পড়লো না বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সোশ্যাল মিডিয়া বেছে নিলেন। কী সুন্দর ভাবনা।
গত দুদিন ধরে ভাইরাল হয়েছে ‘রাগ করলা’ শিরোনামে একটি কনটেন্ট। মিডিয়াগুলো বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করছে। ‘রাগ করলা, কথাটা ঠিক না বেঠিক?’ নতুন এ সংলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই হাস্যরস, ব্যঙ্গ কিংবা খোঁচা দেওয়ার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন এ সংলাপ। ভাইরাল হওয়া সংলাপের উৎস একটি ভিডিও। আমাদের সমাজে ভাইরাল হওয়ার নেশায় অনেকেই এমনটা করছেন। আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। মার্কিন লেখক সেথ গোডিনের তার একটি প্রবন্ধে ‘ভাইরাল’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছেন। ২০০০ সালের ৩১ জুলাই ‘আনলিশ ইয়োর আইডিয়া ভাইরাস’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ফাস্ট কোম্পানি ডটকমে। সেখানে বলেছিলেন, ‘হ্যাভ দ্য আইডিয়া বিহাইন্ড ইয়োর অনলাইন এক্সপেরিয়েন্স গো ভাইরাল। সেই থেকে ভাইরাল শব্দটি সময়ের দখলে।
পৃথিবীতে অনেকেই অনেক গোপন নথিপত্র, ফাইল ফাঁস করে ভাইরাল হয়েছেন। কুকীর্তি ফাঁস করে নায়ক হতে গিয়ে অনেকেই খলনায়কে পরিণত হয়েছেন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় ভাইরাল হলে এটি সমাজের একটি বড় অংশকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। বিরাট একটা প্রভাব পড়ে ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রে। খারাপ কিছু ভাইরাল হলে মারাত্মকভাবে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও আমরা অনুকরণপ্রিয় জাতি।
আমরা খারাপটাকে আলোর বেগে গ্রহণ করতে সক্ষম। ভাইরাল শব্দটি এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে কেউই থেমে নেই ভাইরাল হওয়ার টাপটে। রীতিমতো ভাইরাল হওয়ার চর্চাও করছেন। চর্চা যদি করতেই হয়, সার্বজনীন পরিবর্তনের মানসিকতায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ভালো জিনিসের কদর আমাদের সমাজে অপ্রতুল। তারপরও নিয়মিত ইতিবাচক বিষয়ে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও কন্টেন্ট অথবা যে কোনো ভালো কাজের ছবি, লিখিত কন্টেন্ট সবার কাছে সমাদৃত হবে বলে প্রত্যাশা রাখি। অবশ্যই ভালো কিছু পোস্ট করলে আপনা-আপনিই শেয়ার করবেন। এ ক্ষেত্রে ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এ ছাড়া সমসাময়িক কোনো ঘটনা অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলে ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক। যাই হোক, বর্তমান প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কারণ এআইয়ের আধিপত্য চলছে এখন। সুতরাং ভাইরাল হওয়ার নেশায় এমন কিছু করা উচিত নয়; যার ফলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী বিসর্জনে যায়। রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঁড়ামির পথ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট।
এসইউ