বিপর্যয়ে দাঁড়িয়ে আরেকটি মহাকাব্য লিটনের, মানরক্ষা বাংলাদেশের
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার সবুজাভ উইকেটে দিনের আলো যত গড়িয়েছে, বাংলাদেশের ইনিংসও তত এক অদ্ভুত দ্বৈততার প্রতীক হয়ে উঠেছে। শুরুতেই টপ এরপর মিডল অর্ডারের অপরিণত আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে এক ব্যাটারের অসাধারণ আত্মসংযম, নান্দনিকতা ও প্রতিরোধের ব্যাটিং। ব্যাট হাতে লিটন কুমার দাস এদিন পাকিস্তানি বোলারদের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন পুরো ইনিংসজুড়ে।
স্কোরকার্ডে হয়তো লেখা থাকবে ১২৬ রানের ইনিংস। কিন্তু যারা পুরোটা দেখেছে, তারা জানে — এটি কেবল একটি সেঞ্চুরি নয়। এটি ছিল ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক শিল্পীর ধৈর্য দিয়ে তৈরি করা এক সৃষ্টি। অবশ্য দলের বিপর্যয়ে লিটনের ব্যাট এর আগেও অনেকবার ঢাল হয়ে দাড়িয়েছে। সেই দৃশ্যই দেখা গেলো আরও একবার।
লিটন দাসের ব্যাটিং নিয়ে বহুদিন ধরেই একটি অনুভূতি কাজ করে — তিনি যখন ছন্দে থাকেন, ক্রিকেট তখন কেবল খেলা থাকে না, দৃশ্যশিল্পে পরিণত হয়। আজও তেমনই ছিল। তবে আজকের সৌন্দর্য ছিল আরও গভীর, কারণ এর ভেতরে মিশে ছিল বিপদের ভার, দায়িত্বের চাপ, এবং একা লড়ে যাওয়ার ক্লান্তিহীন সংকল্প। এমন সেঞ্চুরি ক্রিকেটে অনেক হয় না। এমন লড়ে, নিংড়ে, নিজেকে উজাড় করে দেওয়া শতক উপভোগের অভিজ্ঞতাও বিরল।
বাংলাদেশ যখন ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেললো, তখন ম্যাচের ভেতরের বাস্তবতা ছিল নির্মম। এরপর আর কোনো স্বীকৃত ব্যাটার নেই। টেইল এন্ডারদের নিয়েই এগোতে হবে। অথচ সেই মুহূর্তে লিটন দাস ব্যাটিং করছিলেন এমন এক প্রশান্ত নিয়ন্ত্রণে, যেন বিশৃঙ্খলার মাঝেও তিনি নিজের জন্য আলাদা এক ছন্দ তৈরি করে নিয়েছেন। তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ৬০, শরিফুল ইসলামের সঙ্গে ৩৮ এবং তাসকিন আহমেদের সঙ্গে ৬৪ রানের জুটি — সংখ্যার চেয়ে অনেক বড় ছিল এর গুরুত্ব। জুটিগুলোর বেশিরভাগ রান এসেছে লিটনের ব্যাট থেকে, কিন্তু সেই রানও এসেছে অসংখ্য হিসেব কষে। শেষ ৪ উইকেটে ১৬২, যেখানে লিটনের ১২৪। ১৫৯ বলের ইনিংসে ১৬ চার ৩ ছক্কা
তিনি নিয়মিত সিঙ্গেল ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিশ্চিত এক রান নেওয়ার সুযোগ থেকেও সরে গেছেন, যাতে অন্যপ্রান্তে থাকা বোলারদের এক্সপোজ করতে না হয়। রমিজ রাজা কমেন্ট্রিতে বলছিলেন, অন্তত ৩০ রান লিটন নেননি শুধুমাত্র স্ট্রাইক ধরে রাখার জন্য। এই প্রতিটি সিদ্ধান্তের ভেতরে ছিল আত্মত্যাগ। কারণ প্রতিটি সিঙ্গেল ফিরিয়ে দেওয়া মানে একটি রান কমে যাওয়া, আবার পরের বলে নতুন ঝুঁকি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়া। ফলে লিটনকে ওভারের চার কিংবা পাঁচ নম্বর বলেও অস্বাভাবিক শট খেলতে হয়েছে, কেবল স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখার জন্য। এতে তার আউট হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। অথচ সেই ঝুঁকির মধ্যেও ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য বিন্দুমাত্র নষ্ট হয়নি।
আজকের ইনিংসে বাউন্সারের বিপক্ষে লিটনের স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫০। বাংলাদেশের বাকি ব্যাটারদের সম্মিলিত স্ট্রাইক রেট সেখানে মাত্র ৬.৩। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, একই উইকেটে থেকেও তিনি অন্য এক মানের ব্যাটিং করছিলেন। আজকের গ্রিনটপে তার ব্যাটিং ছিল বোলার-কন্ট্রোল্ড ব্যাটিংয়ের সংজ্ঞা। বলের গতি, বাউন্স, মুভমেন্ট সবকিছুকে বুঝে নিয়ে, সেগুলোর বিরুদ্ধে নিজস্ব ছন্দ তৈরি করার বিরল ক্ষমতা দেখা গেছে তার মধ্যে।
৮৭ থেকে ৯১-এ যাওয়ার সময় স্কয়ারের সামনে সেই সুইপ শটটি ডিপ মিডউইকেট আর কাউ কর্নারের মাঝখান চিরে যাওয়া। সেটি ছিল নিখুঁত ব্যালেন্স, টাইমিং আর কব্জির শিল্পের এক অসাধারণ উদাহরণ। ব্যাটিংয়ের সূক্ষ্ণতা যারা বোঝেন, তারা জানেন এমন শট কতটা কঠিন। আবার শতকের পর সেই সিলি কভার ড্রাইভ, যেন মাঠে থাকা বাবর আজমকেও ব্যাটিংয়ের আরেক ভাষা দেখিয়ে দেওয়া। ফ্রন্ট-ফুট পুলটিও ছিল বিস্ময়কর। এমন শট সাধারণত দর্শকদের শুধু করতালি দেয় না, কিছুক্ষণ নীরবও করে দেয়।
এই ইনিংসের সবচেয়ে মুগ্ধকর দিক ছিল, টেইল এন্ডারদের নিয়ে লড়াই করতে করতেও লিটন নিজের ব্যাটিংয়ের শিল্পচেতনা বিসর্জন দেননি। বরং কঠিন বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়েই তিনি যেন মাঠে নিজের মোনালিসা এঁকেছেন। যে ব্যাটার ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু স্ট্রাইক বাঁচানোর চিন্তায় থাকে, তার ব্যাটিং সাধারণত কৃত্রিম হয়ে যায়। কিন্তু লিটনের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। তিনি একইসঙ্গে বেঁচে থেকেছেন, আবার সৌন্দর্যও তৈরি করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতেই ৩৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। সেবারও ত্রাতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন লিটন। রাওয়ালপিন্ডিতে ২৬ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর লিটন যে ১৩৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন, সেটিকে এখনও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা ইনিংসগুলোর একটি ধরা হয়। সেখানে পাশে ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ, করেছিলেন ৭৮। অর্থাৎ অন্তত আরেকজন ব্যাটার ছিল, যার ওপর কিছুটা আস্থা রাখা যায়। আজকের বাস্তবতা ছিল আরও কঠিন। ১১৬/৬-এর পর থেকেই লিটনকে কার্যত টেইল নিয়েই লড়তে হয়েছে।
স্বীকৃত ক্রিকেটে ২০ হাজার রান পার করার দিনেই তিনি আবার মনে করিয়ে দিলেন, কেন তার বড় ইনিংসগুলো প্রায় সবসময়ই আসে বিপর্যয়ের ভেতর থেকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪৯/৪ অবস্থায় ১১৪, মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৪/৫ থেকে ১৪১, রাওয়ালপিন্ডিতে ২০/৪ থেকে ১৩৮, আর আজ ১০৬/৪ ও ১১৬/৬ থেকে ১২৬। এই ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয়। টেস্ট ক্রিকেটে চার উইকেটের কমে ৫০ রানের নিচে দল থাকার সময় ক্রিজে নেমে সবচেয়ে বেশি তিনটি শতক এখন লিটনের। এ কারণেই তাকে বলা হয় — ক্রাইসিস ম্যান। পথভাঙা ব্যাটার। দ্য পাথ-ব্রেকার।
সিলেটের ড্রেসিংরুম তাই আজ কেবল একটি শতক উদযাপন করেনি। তারা বুঝেছে, এই ১২৬ আসলে কত বড়। মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম — সবাই জানেন, এমন ইনিংস সামনে থেকে দেখা আনন্দের। কারণ এটি কেবল রান নয়; এটি প্রতিরোধ, দায়িত্ববোধ, শিল্প আর আত্মত্যাগের বিরল সংমিশ্রণ। অনেক শতক সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু শতক থেকে যায় ক্রিকেট-স্মৃতির ভেতরে, এক অনন্ত আলোর মতো। লিটন দাসের সিলেটের এই ইনিংস ঠিক তেমনই এক আলো।
এসকেডি/আইএন