শত্রু শিবিরে হাথুরু : চিন্তিত নন মাশরাফি

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৪:৫০ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮
শত্রু শিবিরে হাথুরু : চিন্তিত নন মাশরাফি

এইতো মাস দুয়েক আগেও তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কোচ। সেই চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এখন শ্রীলঙ্কার কোচ। চার বছর যারা ছিলেন তার শিষ্য, সেই মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহদের এখন বধ করার ছক আঁটছেন তিনি।

ত্রিদেশীয় ক্রিকেট আসর শুরুর আগে থেকেই চারিদিকে প্রশ্ন, চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কী এখন ‘ঘরের শত্রু বিভীষন’ হয়ে উঠবেন? চার বছর বাংলাদেশ দলে থেকে এখন প্রতিপক্ষ শিবিরে গিয়ে টাইগারদের কাবু করা কি কিছুটা সহজ হয়ে যাবে হাথরুর জন্য?

আগামীকাল (শুক্রবার) বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কা ম্যাচের আগে সে প্রশ্ন আরও জোরালো হলো। অফিস-আদালত, রেস্টুরেন্ট, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়- সর্বত্রই একটা কৌতুহলি প্রশ্ন, ‘আচ্ছা হাথুরুসিংহে তো বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ও টিম বাংলাদেশের হাঁড়ির খবর জানেন। তার কৌশল আঁটা নিশ্চয়ই আরও সহজ হয়ে যাবে! সবার দূর্বলতা-ফাঁকফোকর তার জানা। এখন শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে লঙ্কানদের সেই সব দুর্বল জায়গাগুলোয় আঘাত হানার কৌশল শিখিয়ে দেবেন হাথুরু!

সেটা কি চিন্তার কারন নয়? মোটকথা, কালকের ম্যাচে কী অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজের দলের চেয়ে হাথুরু বাংলাদেশের জন্য বড় চিন্তার কারণ? শুক্রবার ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।

শুধু হাথুরুসিংহের কারণেই এ ম্যাচটি পেয়েছে অন্য মাত্রা। এটা ডাবল লেগের আসর। বাংলাদেশ এক ম্যাচ জিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। শ্রীলঙ্কা আছে তলানিতে। কাজেই এ ম্যাচ কোনোভাবেই বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াই নয়।

তারপরও চারিদিকে কেমন একটা সাজ সাজ রব- ‘আরে কাল তো বাংলাদেশ ভার্সেস হাথুরুর লড়গাই।’ এই ম্যাচটির দিকেই এখন চোখ সবার। লড়াইটা যে শুধু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নয়, হাথুরুসিংহের বিপক্ষেও!

নিজের দেশের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কিভাবে কাজে লাগান হাথুরু, সেটি দেখতে মুখিয়ে সবাই। আর টাইগার সমর্থকদের মনে ঘোর দুশ্চিন্তা, ম্যাচে আবার এর প্রভাব পড়বে না তো!

মাশরাফি বিন মর্তুজাকেও এই বিষয়টি নিয়ে পড়তে হলো প্রশ্নের মুখে। বৃহস্পতিবার শেরেবাংলার কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলনে উঠল প্রশ্ন। বাংলাদেশ অধিনায়কের কাছে জানতে চাওয়া হলো হাথুরুসিংহের শত্রু শিবিরে থাকা নিয়ে কি ভাবছেন?

আজ সংবাদ সম্মেলনে নানাভাবে ঘুরেফিরে অন্তত বার তিনেক অনেকটা এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন টাইগার অধিনায়ক। তবে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মাশরাফি যা বললেন, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আর শরীরি অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো তিনি হাথুরু ইস্যু নিয়ে একদমই মাথা ঘামাতে রাজি নন। এক কথায় হাথুরু প্রসঙ্গ নিয়ে মোটেই ভাবছেন না বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা।

তাইতো মুখে এমন কথা, ‘সত্যি কথা বলতে কি, এসব ম্যাটার করে না। মনের কোনে থাকে ম্যাচটা খেলতে হবে, জিততে হবে। এর বাইরে আর কোন কিছু ভাবার ও চিন্তা করার সুযোগই নাই। চিন্তা করলে আল্টিমেটলি আরও বেশি চাপ আসে। আমার কাছে মনে হয় খেলার দিকেই সবার মনোযোগ থাকে। সেটাই আছে। আমাদের চিন্তা একটাই; আমরা যেন আরও ভালো খেলি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যেভাবে খেলেছি সেভাবে খেলি। ওটা নিয়েই সবাই ভাবছে।’

ধরে নেয়া গেল, আপনার দল হাথুরুর কথা না ভেবে নিজেদের ভাল খেলার চিন্তায় মশগুল। তবে কি সাবেক কোচকে চমকে দেয়ার কথা ভাবছেন? তাকে বিমূঢ় করে দেয়ার নতুন কোন ছক কষছেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি বলেন, ‘আলাদা করে চমক দেওয়ার কিছু নেই। যেটা হচ্ছে আমরা যেভাবে খেলতাম সেভাবেই খেলবো। হাথুরুসিংহে থাকতেও এখানে এসে বলতাম আমরা আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা নিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই।’

এটুকু বলার পর মাশরাফি কিছু কথা বলেছেন। যার ভাবার্থ হলো, তার দল এখন অনেক স্বাধীনতা নিয়ে খেলছে। এর স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আপনি যদি দেখেন, আমরা তার কাছ থেকে ঠিক যেমন অ্যাপ্রোচ আশা করেছিলাম, প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর পর বিজয় দলে এসে ঠিক সে যেভাবে ক্রিকেট খেলেছে। আমরা এটাই চাই। ভয়হীন ক্রিকেট খেলুক।’

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাত্র ১৭১ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা আক্রমণাত্মক করলেও এনামুল হক বিজয় আউট হয়েছেন ১৯ রান করে। রান বেশি করতে না পারলেও বিজয়ের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিটা ভালো লেগেছে মাশরাফিদের। সেটাই বিজয়ের কাছ থেকে চান তারা।

এ নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘(জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) ওর জায়গা থেকে ওর রানটাকে বড় করার সুযোগ ছিল। কারণ লক্ষ্যটা এতো বড় ছিলো না। আমাদের সেই চাপও ছিলো না। তারপরও ও যেভাবে ব্যাটিং করেছে আমরা শতভাগ তাকে ব্যাকআপ করবো। এটা দেখা যায় যে, সে অনেক পজিটিভ। তার মাইন্ড সেটআপ আমরা দল থেকে যেটা চাই সেভাবেই সে খেলেছে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, মাঠের বাইরের কোন ইস্যু (হাথুরু ইস্যুও দিকে ইঙ্গিত করে) নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে নিজেদের লক্ষ্য-পরিকল্পনা ও অ্যাপ্রোচ-অ্যাপ্লিকেশনের কথা ভেবে খেললে অনেক বেশি উপকার হয়। তা বড় বড় ম্যাচ বা ভালো ম্যাচ জিততে সহযোগিতা করবে।’

হাথুরুসিংহের ওপর চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে কি কম্বিনেশনে রদ বদলের কোন চিন্তা ভাবনা আছে? মাশরাফির জবাব, ‘চ্যালেঞ্জ আসলে সব জায়গাতেই থাকে। হাথুরুসিংহে যখন এখানে ছিলেন তখন তার ওপরে এক রকম চ্যালেঞ্জ ছিল। হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা পুরোটা হেরে আসার পর তিনি যদি এখন আমাদের কোচ থাকতেন, তাহলে তার চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি হত। আরও উপভোগ্য হত। তিনি হয়তো থাকেননি, তিনি শ্রীলঙ্কাকে বেছে নিয়েছেন। এখন তার আরেক রকম চ্যালেঞ্জ।’

হাথুরুর এই না থাকাটা আরও একটি চ্যালেঞ্জ। অর্থ্যাৎ খেলতে গেলে চ্যালেঞ্জ সব সময় থাকবেই। মাশরাফি বলেন, ‘আমাদের চ্যালেঞ্জ, তিনি (হাথুরু) যখন ছিলেন তখন তার কথা তো সব আমরাই শুনেছি। তো চ্যালেঞ্জ তো সব সময় আমাদেরকেই নিতে হয়। এই চ্যালেঞ্জটা থাকছে, এখনও যে নাই তা নয়। আর আমরা এই টুর্নামেন্টটা যদি জিতিও পরের সিরিজে তো একই চাপ থাকবে। প্রত্যাশাও তৈরি হয়। আপনি যখন বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন এই চ্যালেঞ্জ থাকবেই। এটা নতুন কিছু নয়। আমরা যে কখনো চাপ সামলাইনি এমন নয় বা এখন সামলাতে পারব না এমন নয়। এখন আসল ব্যাপার হচ্ছে আমরা বাস্তবায়ন কেমন করি?’

তার মানে কি দাঁড়ালো? টাইগার অধিনায়ক চান সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ প্রয়োগ। সেটাই আসল লক্ষ্য। চিন্তা-চেতনার সবটুকু জুড়েই সামর্থ্যরে বাস্তব রূপ দেয়ার ভাবনা। সেখানে হাথুরুর অস্তিত্ব নেই।

আইএএইচ/পিআর