মায়ের অনুপ্রেরণায় মাঠে জয়িতা: হকি থেকে নারী ক্রিকেটে জুয়াইরিয়ার পথচলা

সৌরভ কুমার দাস
সৌরভ কুমার দাস সৌরভ কুমার দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০১ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২৬

জাতীয় দলের হয়ে হকি খেলেছেন। কাবাডিও খেলতে পারেন। ২০২৩ সালের যুব গেমসে হকি, কাবাডি ও শটপুটে স্বর্ণও জিতেছেন। এরপর জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের হয়েও খেলেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও দেখা যেতে পারে তাকে। বলছি নারী ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার জুয়াইরিয়া ফেরদৌস জয়িতার কথা।

শিক্ষক মায়ের অনুপ্রেরণায় একদম শৈশব থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে উঠে এসেছেন সাফল্যের শীর্ষে। তবে নারী হিসেবে এই পথচলায় তাকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

আজ নারী দিবস। নারীদের সম্মানে প্রতিবছর এই দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এবারের নারী দিবসে জাতীয় ক্রিকেট দলের নারী ক্রিকেটার জুয়াইরিয়া ফেরদৌস জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে শুনিয়েছেন তার উঠে আসার গল্প, ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অভিজ্ঞতাসহ নানা কথা। সেগুলোর চুম্বক অংশ জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো—

জাগো নিউজ: আজ তো নারী দিবস। আপনার কাছে নারী দিবসের মানে কী? এই দিনটি কি আলাদা কোনো অনুভূতি তৈরি করে?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: নারীদের সম্মান এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা- এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা যেভাবে দিনের পর দিন সংগ্রাম করে যাচ্ছে, তাদের সেই সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকেই নারী দিবসের গুরুত্ব আসে।

জাগো নিউজ: নারী হিসেবে মাঠে এবং মাঠের বাইরে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: নারী হিসেবে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। চাকরির ক্ষেত্রেও যেমন আছে, খেলাধুলায় তো আরও বেশি। খেলাধুলার সময় ছেলেদের মতো পোশাক পরে খেলতে হয়। আশপাশের মানুষ- শুধু তরুণরা নয়, অনেক মুরব্বিও বলেন মেয়েদের ঘরে থাকা উচিত, বাইরে যাওয়া বা খেলাধুলা করা উচিত নয়। এমন কথাও শুনতে হয় যে মেয়েরা এত পড়াশোনা করেই বা কী করবে, তাদের তো রান্নাবান্নাই করতে হবে। এসব কথা আমাদের প্রায়ই শুনতে হয়।

এখন মেয়েদের প্রতি অন্যায় ও নির্যাতনের ঘটনাও বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। রাস্তায় চলাফেরা করতেও অনেক সময় মেয়েদের হয়রানির শিকার হতে হয়।

জাগো নিউজ: নারী ক্রিকেটার হিসেবে আপনার কী মনে হয়- স্পোর্টস, বিশেষ করে ক্রিকেটে নারীদের জন্য কোন জায়গাগুলোতে আরও কাজ করার প্রয়োজন আছে?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: স্পোর্টসকে উন্নত করতে হলে আমাদের বড় বড় দেশের দিকে তাকাতে হবে- যেমন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, এমনকি এশিয়ায় ভারত। তারা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং নিয়মিত টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সুযোগটা এখনও খুব বেশি নেই।

Juairia

তাই খুবই জরুরি যে স্কুল বা প্রাইমারি লেভেল থেকেই খেলাধুলার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। ছোটবেলা থেকেই যদি মেয়েরা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতে পারে, তাহলে তাদের দক্ষতা দ্রুত উন্নত হবে এবং বড় হয়ে আরও ভালো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।

জাগো নিউজ: খেলাধুলায় আসার শুরুর গল্পটা যদি বলেন।

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: আমার খেলাধুলায় আসার শুরুটা হয়েছে আম্মুর মাধ্যমে। তিনি হাইস্কুলের ফিজিক্যাল টিচার ছিলেন। আম্মুকে দেখতাম মেয়েদের নিয়ে কাজ করতেন, খেলাধুলা শেখাতেন। আমি প্রায়ই তার সঙ্গে যেতাম। ওখান থেকেই খেলাধুলার প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়।

জাগো নিউজ: আপনি তো অনেক ধরনের খেলাই খেলেছেন। ২০২৩ সালের যুব গেমসে স্বর্ণও জিতেছেন। এই অনুপ্রেরণাটা কি আপনার মায়ের কাছ থেকেই এসেছে?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: হ্যাঁ, সব অনুপ্রেরণাই আমার আম্মুর কাছ থেকে। আমার আম্মু নিজেও একজন অ্যাথলেট ছিলেন। আমার মনে হয় জন্মগতভাবেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহটা আমার মধ্যে এসেছে। সেখান থেকেই আমার শুরু।

জাগো নিউজ: হকিও খেলেছেন। হকি থেকে ক্রিকেটে কিভাবে এলেন?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল- জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন। ক্রিকেটে আসা সহজ ছিল না। আমি ক্রিকেটের পাশাপাশি হকিও খেলতাম। আগে ক্রিকেট খেলেছি, পরে হকি শুরু করেছি। ধীরে ধীরে হকিতে ভালো করতে শুরু করি।

২০১৬ সালে ঢাকায় একটি টুর্নামেন্ট হয়েছিল। সেই টুর্নামেন্টের মাধ্যমেই আমি জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাই।

জাগো নিউজ: আপনি বললেন অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আপনার মা আপনাকে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু যেসব মেয়েরা পরিবার থেকে সেই সমর্থন পায় না, তাদের জন্য যাত্রা কতটা কঠিন?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: আমার মা আমাকে অনেক সমর্থন দিয়েছেন, তবুও আমাকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যাদের পরিবারে কেউ খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত নয়, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও কঠিন।

আমাদের দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বিভিন্ন জেলা শহর বা গ্রাম থেকে এসেছে। গ্রামের পরিবেশে মেয়েদের খেলাধুলা করা এখনও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই পরিবারের কাছে গিয়ে নানা কথা বলে- মেয়েকে কেন খেলাচ্ছেন, ঘরে রাখুন, মানুষ খারাপ বলবে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেক মন্তব্য আসে।

এসবের কারণে অনেক সময় মনে হয়েছে খেলাধুলা ছেড়ে দেব। কিন্তু এতকিছু সহ্য করেই আমরা আজ এখানে পৌঁছেছি।

জাগো নিউজ: এখন অনেক দেশে নারী ও পুরুষ ক্রিকেটারদের সমান বেতন দেওয়া হয়। আপনারা কি সেই প্রত্যাশা করেন?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: অবশ্যই আমরা সেটা আশা করি। বাংলাদেশের মেয়েরা ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় ভালো করছে। যদি কখনো বোর্ড এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে মেয়েরা আরও ভালো পারফর্ম করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

জাগো নিউজ: আপনার কাছে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে কী বোঝায়?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: ক্ষমতায়ন মানে শুধু টাকা-পয়সা নয়। স্বাধীনতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা- দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী যখন শিক্ষিত হয় এবং আয় করতে শেখে, তখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তখন আর অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় না।

জাগো নিউজ: নারী দিবসে ভবিষ্যতের তরুণ নারী ক্রিকেটারদের জন্য আপনার বার্তা কী?

জুয়াইরিয়া ফেরদৌস: নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এগিয়ে যাও। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে ভালো কিছু অবশ্যই আসবে।

এসকেডি/আইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।