অযত্ন আর অবহেলার কবলে ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ
স্থাপত্য শিল্পের কারুকার্য খচিত অতীত ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ (মিয়ার মসজিদ নামে পরিচিত)। খুলনা-পাইকগাছা সড়কের তালার তেঁতুলিয়া এলাকার প্রধান সড়কের ধারে এক একর জমির উপর মসজিদটি নির্মিত। পাশেই রয়েছে দুই একরের এক বিশাল দিঘি।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটির দায়িত্ব নিলেও অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে প্রায় দুই শতাব্দীর পুরানো প্রাচীন ঐতিহ্যের স্বাক্ষী এ মসজিদটি।
স্থানীয় প্রবীনদের ভাষ্যমতে, ১৬শ শতাব্দীর প্রথমদিকে মোঘল আমলে তেঁতুলিয়া গ্রামে তৎকালীন মুসলিম ধার্মিক জমিদার কাজী সালামতুল্লাহ খান বাহাদুর এটি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে জমিদার প্রথা না থাকলেও জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও তাদের নির্মিত মসজিদটি কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মুড়াকলিয়া গ্রামের কলিমউদ্দীন সরদার জাগোনিউজকে জানান, তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশ থাকাকালীন সময়ে বিহারের এক বাসিন্দা মসজিদটির নকশা ও কারুকাজের জন্য প্রধান মিস্ত্রির দায়িত্বে ছিলেন।
তিনি আরো বলেন, এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে মসজিদটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পর প্রধান সেই মিস্ত্রীর দুই হাত কেটে নেওয়া হয়। যেন তিনি নতুনভাবে অন্য কোনো স্থানে এই নকশা বা আকৃতির মসজিদ আর নির্মাণ করতে না পারেন। তার জন্য মিস্ত্রির পরিবারের দায়ভারও গ্রহণ করেন এই জমিদার।
মসজিদটির উত্তর পার্শ্বে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি। মসজিদ থেকে সিঁড়ি গিয়ে মিশেছে দীঘির তলদেশে। মসজিদটির চার পাশ ঘিরে চার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট সীমানা প্রাচীর। মসজিদটিতে ছোট বড় মিলিয়ে রয়েছে ১৮টি মিনার।
জমিদার কাজী সালামতউল্লাহর বংশধর দাবি করে লন্ডন প্রবাসী মন্টি সিদ্দিকীর লাগানো একটি প্লেটে উল্লেখ রয়েছে, মসজিদটি তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ নামে পরিচিত। ১৮৫৮-৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা খান বাহাদুর মৌলভী কাজী সালামতউল্লাহ। যা মোঘল মনুমেন্টস অব বাংলাদেশ নামক গ্রন্থে প্রকাশিত তথ্য দ্বারা প্রমাণিত। তিনি তেঁতুলিয়ার জমিদার ছিলেন।
তেঁতুলিয়ার কুরসিনামা অনুযায়ী, কাজী সালামতউল্লাহ ১৮০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলের ডেপুটি কালেক্টর এবং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন তিনি। ধারণা করা হয়, রাস্তার অপর পাশের জমিদার বাড়িটিও একই সময়ে নির্মিত।
এই মসজিদটির সঙ্গে ১৮৪০-৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার শাহযানী বেগম মসজিদ এবং ১৮৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময় থেকে শেষের দিকে কাজী সালামতউল্লাহর প্রো-পিতামহ কাজী বাকাউল্লাহ খানকে যশোরের নায়েব কাজী এবং ফতেয়াবাদের (যা বর্তমানে ফরিদপুর নামে পরিচিত) কাজীর সনদ দেওয়া হয়েছিল। 
জনশ্রুতি রয়েছে, সালামতউল্লাহ শাহী জামে মসজিদ থেকে কোয়ার্টার মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এক গম্বুজ বিশিষ্ট পুরাতন শাহী জামে মসজিদটি (ভাঙ্গা মসজিদ) কাজী বাকাউল্লাহ খান বা তার অনুসারিরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তেঁতুলিয়ার জমিদার পরিবার ব্যতীত অন্যকারো পক্ষে মসজিদটি নির্মাণ করা দূরহ ব্যাপার।
বর্তমানে অযত্ন আর অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটির সৌন্দর্য নষ্ট হতে বসেছে। ৭টি মিনার ভেঙে পড়ার উপক্রম। মসজিদের বাউন্ডারি এলাকায় বহু অজানা ব্যক্তিদের কবরের চিহ্ন থাকলেও সেগুলো অরক্ষিত।
স্থাপত্য শিল্পের কারুকার্য খচিত এ মসজিদটি তেঁতুলিয়া ও তালা উপজেলাকে মানুষের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ সংরক্ষণের দ্বায়ভার নিলেও সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি অভিযোগ করে স্থানীয় সৈয়দ জুনায়েদ আকবর জাগোনিউজকে জানান, মসজিদটির ফ্লোরে ও পশ্চিম পাশের দেয়ালের উপরের অংশে ফাটল ধরেছে। যদি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয় তবে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্বাক্ষী তেঁতুলিয়া শাহী জামে মসজিদ (মিয়ার মসজিদটি) কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে।
আকরামুল ইসলাম/এফএ/পিআর