মিলন হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর : জমা হয়নি রিপোর্ট


প্রকাশিত: ০৩:৫০ পিএম, ২৬ জুলাই ২০১৬

আজ ২৭ জুলাই বুধবার। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডাকাত সাজিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে (১৬) পিটিয়ে হত্যা ঘটনার ৫ বছর অতিবাহিত হতে চলছে।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কর্তৃক দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) প্রত্যাখান করে পুনঃতদন্ত করে দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়ার সিআইডিকে নির্দেশ দেয়ার ৯ মাসও কেটে গেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু এখনো আদালতে সিআইডি সে রিপোর্ট জমা দেয়নি।

দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলাটির ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে নিহত মিলনের স্বজন ও এলাকাবাসী।

তবে সিআইডির এক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মামলার অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে এর পিছনে যে পরিমাণ সময় দেয়া উচিত ছিল, তা দেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলাটি ও একই সংস্থা তদন্ত করায় বেশির সময় তার পিছনের দেয়া হয়েছে। তারপরও দ্রুত সময়ে মিলন হত্যা মামলার রিপোর্ট জমা দেয়া হবে।

এর আগে গত বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী জেলা পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) ওসি আতাউর রহমান ভূঁইয়া মামলায় তদন্তে ভিডিও চিত্র দেখে হত্যার ঘটনায় শনাক্ত হওয়া ২৭ ব্যক্তি ও চার পুলিশ সদস্যসহ ৩২ জন আসামির সবাইকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে নোয়াখালীর দুই নম্বর আমলি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল) রিপোর্ট দাখিল করেছিলেন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা ভিডিও চিত্র দেখে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত ২৭ জন আসামি এবং এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মামলার দায় হতে অব্যাহতির আবেদন করেন। এছাড়া উল্লেখিত ২৭ জন আসামির মধ্যে একজন (শাহ আলম) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বাদীর মামলা না চালানোর আবেদনের বরাত রয়েছে।

পাশাপাশি এজহারে বর্ণিত ঘটনা সত্য ঘটনা বলিয়া প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হইলেও কে বা কাহারা উক্ত ঘটনা করিয়াছে উহা প্রমাণ করার মত পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় ভবিষ্যতে মামলা প্রমাণ করার মত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে বলে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

কিন্তু গত ৫ নভেম্বর নোয়াখালী ২ (দুই) নম্বর বিচারিক আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা ভূঁইয়া ডিবি-পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শেষে প্রতিবেদন গ্রহণ না করে মামলাটি অধিকতর তদন্ত করে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের জন্য জেলা সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে নির্দেশের ৯ মাস কেটে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া ইউনিয়নের লোকজন ২০১১ সালের ২৭ জুলাই ছয় ডাকাতকে পিটিয়ে হত্যা করে। কিশোর মিলন ওই দিন সকালে চর ফকিরা গ্রামের বাড়ি থেকে উপজেলা সদরে যাচ্ছিলেন। পথে চর কাঁকড়া একাডেমি স্কুলের সামনে থেকে একদল লোক তাকেও ডাকাত সন্দেহে আটক করে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেন।  

কোম্পানীগঞ্জের তৎকালীন এসআই মো. আকরাম শেখের নেতৃত্বে একদল পুলিশ মিলনকে থানায় না নিয়ে ডাকাত সাজিয়ে চরকাঁকড়া ইউনিয়নের টেকের বাজারে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন। এরপর লোকজন নিরাপরাধ কিশোর মিলনকে পুলিশের উপস্থিতিতে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘটনার কয়েকদিন পর মুঠোফোনে ধারণকৃত ভিডিও চিত্রে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের খবর গণমাধ্যমে ওঠে আসে।

এ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় উঠে। এ ঘটনার পর ২০১১ সালের ৩ আগস্ট মিলনের মা কোহিনুর বেগম বাদী হয়ে নোয়াখালীর ২ নম্বর আমলি আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ৮ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ থানায় মামলাটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রথমে এ মামলার তদন্ত করে স্থানীয় থানা-পুলিশ। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত পায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি পুলিশের একাধিক তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। মামলা দায়েরের পর মিলন হত্যাকাণ্ডের স্থলে উপস্থিত থাকা পুলিশ সদস্যকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা স্বপদে ফিরে যান।

Noakhali-Milon-Murder

অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইন্সপেক্টর রফিক উল্লা বর্তমানে বান্দরবান সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ বাগেরহাটের মংলা থানায়, আর হেমারঞ্জর নিঝুম দ্বীপ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও আবদুর রহিম চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত আছেন। এছাড়া গণপিটুনীতে অংগ্রহণকারিদের মধ্যে ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্তকৃতদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের সবাই জামিনে বের হয়েছেন।

নিহত মিলনের মা ও মামলার বাদী কহিনুর বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে জাগো নিউজকে জানান, তার নিরাপরাধ ছেলে মিলন হত্যার পাঁচটি বছর কেটে যাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে এখন ছেলেকে দেখতে পান। কিন্তু ছেলেতো নেই। ছেলে হত্যার বিচারের আশায় বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেছেন। ডিবি পুলিশের কাছে বার বার ধরণা দিয়েছেন। ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়েও আদালতে অভিযোগপত্র দেয়নি পুলিশ-ডিবি।

সিআইডিকে দেয়ার ও কয়েক মাস হয়ে গেল। তাছাড়া মিলনের বাবাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে পুলিশ সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর সংসারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মিলনের ছোট ভাই সালাউদ্দিন পাভেলকে পুলিশে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেয়ায় এবং নানামুখী চাপ দেয়ায় তিনি এক পর্যায়ে  মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হয়েছিলেন।

মিলনের বাবা গিয়াস উদ্দিন একটু ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেন, সিলেট ও খুলনায় দুই শিশু হত্যা মামলার রায় দ্রুত সময়ে হয়েছে। কিন্তু তার ছেলে হত্যার পাঁচ বছর হয়ে গেল এখনো কোনো বিচার পাননি।

তিনি আরো জানান, তার জনও নাই আবার অর্থও নাই। থাকলে বিচার ঠিকই পেতেন। তবে তার আশা একদিন আল্লাহর তরফ থেকে ঠিকই বিচার পাবেন। উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এবং পুলিশ বিভিন্ন লোভ-লালসা দেখিয়ে সৌদি আরব থেকে তাকে দেশে আনার পর বর্তমানে তিনি বেকার রয়েছেন। সংসার চালাতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে।

নিহত মিলনের ছোট ভাই সালাউদ্দিন পাভেল বলেন, তার ভাইকে হত্যার পর অনেকে এসেছেন। বিভিন্ন ভাবে তাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। তার লেখাপড়ার খরচ চালানো আশাও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই হয়নি। বর্তমানে নিজের লেখাপড়ার খরচের পাশাপাশি সংসারে আরো দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ পুলিশে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেয়ায় এবং নানামুখী চাপ দেয়ায় তার মাকে দিয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি করানো হয়। কিন্তু তার চাকরি এখনো হয়নি।

বাদিপক্ষে মামলার আইনজীবী নোয়াখালী জেলা মহিলা আইনজীবী সমিতির অ্যাড. কল্পনা রানী দাস জাগো নিউজকে জানান, আগামী সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ মামলাটির অধিকতর তদন্তের রিপোর্ট প্রাপ্তির দিন ধার্য্য রয়েছে আদালতে। তিনি মামলাটির ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন।

নোয়াখালী জজ কোর্টের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাড. এটিএম মহিব উল্যাহ জাগো নিউজকে  জানান, কিশোর মিলন হত্যা মামলাটি চাঞ্চল্যকর একটি মামলা। পুলিশ চার বছর ধরে তদন্ত করে আসামি ট্রেস আউট করতে না পারায় ফাইনাল রিপোর্ট দেন।

এ রিপোর্টে বাদীর নারজি দেয়ায় তারা ম্যাজিস্ট্রেট নথি পর্যালোচনা করে পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের তদন্ত চলমান। তারা (সিআইডি) আদালতে রিপোর্ট জমা দেয়নি। তদন্ত শেষে রিপোর্ট জমা দেয়ার পর বুঝা যাবে এ মামলার ভবিষ্যত কি ?।

মিজানুর রহমান/এআরএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।