দিনাজপুরে দেশের প্রথম নবরথ মন্দিরের সন্ধান
দিনাজপুরে দেশের প্রথম নবরথ মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি এটি যেন উন্মুক্ত করে দেয়া হয় পূজা অর্চনার জন্য।
ভাগবত ও পুরানে ভগবান বিষ্ণুর ২২টি অবতারের কথা বলা হয়েছে, মোহিনী তাদের মধ্যে অন্যতম এবং একমাত্র নারীরূপ। ভারত উপমহাদেশের পূর্বাংশে এটি প্রথম প্রস্তর নির্মিত মোহিনীর প্রতিমা। দেশের চিহ্নিত একমাত্র নবরথ মন্দির ও তার প্রত্নতত্ত্বিক নিদর্শনগুলো নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে এই অঞ্চলে উন্নত ও সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে আরো তথ্য পাওয়া যাবে বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ডাবোর ইউনিয়নের মাধবগাঁও এলাকায় নবরথ মন্দিরটি একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি দল এখানে খনন শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এই খনন কাজের অর্থায়ন করে। মাত্র দুই সপ্তাহের খননেই এখানে পুরনো স্থাপত্যশৈলীর মন্দির রয়েছে বলে নিশ্চিত হয় দলটি।
বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে টানা তিন মাসের বেশি সময় ধরে খনন কাজ চালানো হয়। খননকারী দল নিশ্চিত হয় এটি বিষ্ণুমন্দির এবং এর সঙ্গে একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যকার পূর্ব ভারতীয় হিন্দু মন্দিরের গঠনের মিল আছে। বিশেষ করে উড়িষ্যার কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলী, যেটি একাদশ ও দ্বাদশ শতকে বিকশিত হয়েছিল সেই স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে।
মন্দিরটি দুইটি অংশে বিভক্ত। একটি গর্ভগৃহ যেখানে পূজা বা উপাসনা করা হতো, এটি বিশেষ কিছু অভিক্ষেপ দিয়ে চিহ্নিত। এই অভিক্ষেপগুলো স্থাপনা শিল্পের বা শিল্পশাস্ত্রের ভাষা অনুযায়ী রথ বলা হয়। এখানে মোট ১১টি রথ রয়েছে, যার মধ্যে দুইটি উপরথ। পাশাপাশি আরো কিছু আলামতের ভিত্তিতে এটি নবরথ বিশিষ্ট একটি মন্দির বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
খননকালে এখানে প্রস্তর প্রতিমার ভগ্নাংশ হিসেবে হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান প্রতিমার হাতে থাকা শঙ্খ, চক্র, গদা, বিষ্ণু প্রতিমার বনমালা শোভিত পায়ের ভগ্নাংশ এবং একটি দেবী প্রতিমার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে।
খনন কার্যক্রমে বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে আসা অভিজ্ঞ ১৩ জন শ্রমিকের সঙ্গে আরো ২৬ জন স্থানীয় শ্রমিক কাজ করছেন। খনন দলে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ১০ শিক্ষার্থী। তারা এই খননকাজে অংশ নিয়ে স্থাপত্যের নকশা আঁকছেন। পরবর্তীতে কেউ এই স্থাপনা নিয়ে গবেষণা করতে চাইলে এই নকশার সাহায্য নিতে পারবেন।
স্থানীয় স্বপন চন্দ্র রায় জানান, যেহেতু এটি ভগবান বিষ্ণুর মন্দির হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে, তাই এটিকে এভাবেই রেখে দেয়ার দাবি এলাকাবাসীর। যাতে করে তারা এখানে পূজা অর্চনা করতে পারেন। 
একই দাবি জানিয়ে এলাকার ভবেশ চন্দ্র বলেন, ‘যদি এটি এভাবে রেখে দয়া যায় তাহলে আগে মন্দির কী রকমের ছিল, তা জানতে আমাদের এলাকায় অনেকেই আসবেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সীমা হক বলেন, ‘আবিষ্কৃত মন্দিরটির প্রবেশ দ্বার পূর্ব দিকে। প্রাচীন এই মন্দিরের নকশা ও স্থাপত্যশৈলী দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এক সময়ে এই অঞ্চল উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে এই অঞ্চল অবহেলিত হয়ে পড়েছে।
খনন দলের প্রধান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. স্বাধীন সেন জানান, ‘স্থাপনাটির বৈশিষ্ট্য আদিযুগ বা খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতকের পূর্ব ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিছু আলামতের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছেন এটি একাদশ বা দ্বাদশ শতকের নবরথ বিশিষ্ট একটি বিষ্ণু মন্দির।
মন্দিরটি দুইটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম দিকে ১২/১২ মিটার নিরেট প্লাটফর্মের ছোট কক্ষ রয়েছে। যেখানে প্রতিমার উপাসনা হতো। মন্দিরের বাইরে অভিক্ষেপের সংখ্যা ৯টি। তাই এটিকে নবরথ মন্দির বলা হচ্ছে।’
তিনি জানান, এটি বাংলাদেশে আবিষ্কৃত প্রথম নবরথ মন্দির। এর আগে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে একটি পঞ্চরথ মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছিল। মন্দিরটির স্থাপনারীতি ও গঠনশৈলী নিয়ে ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ভারতীয় স্থাপত্যের বিশেষজ্ঞ দীপক সঞ্জন দাসের সঙ্গে আলাপ হলে তিনি জানান, মন্দিরটির উপরিকাঠামো পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলার সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে।
পাশাপাশি খনন কাজের শেষ দিকে ঢিবির পূর্বাংশ থেকে একটি দুষ্প্রাপ্য প্রতিমার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে। প্রতিমাটি সম্পর্কে দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত প্রতিমালক্ষণবিদ ও প্রাচীন শিল্পকলার ইতিহাসবিদ ক্লদিন বুদজে পিক্রো সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিমাটিকে বিষ্ণুর নারী অবতার মোহিনী হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
ক্লদিন জানান, প্রতিমাটি ভারত উপমহাদেশের পূবাংশে এই প্রথম প্রস্তরনির্মিত বিষ্ণুর নারী অবতার মোহিনীর মূর্তি। নবরথ বিষ্ণু মন্দির ও দুষ্প্রাপ্য মোহিনীর প্রতিমা পাওয়ায় এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন ভাবনার মোড় নিয়েছে।
তিনি আরো জানান, ‘খনন কাজ করতে গিয়ে তাদের বড় কোনো সমস্যা হয়নি। বরং এলাকাবাসীর সঙ্গে এক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এখানে যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে, তা খননকারী দলের কাছেই আছে। গবেষণা কার্যক্রম চালানোর জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক তারা এসব নিদর্শন এক বছর পর্যন্ত গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য নিজেদের কাছে রাখতে পারবেন। পরে সেগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা দিতে হবে।
অধ্যাপক সেন জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রত্নতত্ত্ব খননের পর ছবি তোলা ও ড্রয়িং কাজ নথিভুক্ত করার পর সংরক্ষণের জন্য স্থাপত্য কাঠামোটি পুনরায় মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। তাই এই স্থানটিও কয়েকদিনের মধ্যেই মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হবে। 
তবে স্থানীয়দের দাবি রয়েছে, এটি যেন উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, কিন্তু সেটি করতে হলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফরের অনুমোদন প্রয়োজন। জায়গাটি রক্ষণাবেক্ষণ করারও প্রয়োজন হবে। সংরক্ষণ না করেই এভাবে রেখে দিয়ে কিছুদিনের মধ্যে এটি নষ্ট হয়ে যাবে। বিষয়টি এলাকার লোকজনকে বোঝানো হয়েছে এবং প্রায় ৬০০ গ্রামবাসীর স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে স্থানটি সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত করার বিষয়ে।
স্বাক্ষরসহ আবেদনটি স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউএনও, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন দফতরে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ইতিবাচক নির্দেশ আসলেই সংরক্ষণের পর তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া সম্ভব হবে।
তিনি জানান, এসব খনন কাজের যাবতীয় ব্যয়ভার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই দিনাজপুরের বিরল উপজেলার একটি স্থানে খননের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
তিনি আশাবাদী, যেভাবে সরকারি সহযোগিতা তিনি পাচ্ছেন সেভাবেই সহযোগিতা পেতে থাকবেন। আর এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশদ জানা সম্ভব হবে।
এমদাদুল হক মিলন/এআরএ/পিআর