রসরাজের পরিবার কোথায় কেউ জানে না
ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র করে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার রসরাজ দাসের পরিবারের সদস্যরা কোথায় তা এখনো কেউ জানে না।
ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় গত ২৯ অক্টোবর বিকেলে উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের স্থানীয় কয়েকজন যুবক রসরাজকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার পর এদিন রাতেই রসরাজের পরিবারের সদস্যরা সবাই গ্রাম থেকে পালিয়ে যান। এখনো পর্যন্ত রসরাজের পরিবারের সদস্যদের কারো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তবে পুলিশ বলছে, রসরাজের পরিবারের সদস্যরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। রসরাজের ছোট ভাই পলাশের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী আখাউড়ায় পাওয়া গেছে।
এদিকে পশ্চিমপাড়া এলাকার বৃদ্ধ হেমেন্দ্র চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে জানান, সেদিন (২৯ অক্টোবর) দুপুরে পশ্চিমপাড়া এলাকার বিল্লাল মিয়ার ছেলে হেলালের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক রসরাজকে স্থানীয় মনা দাসের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তারা রসরাজকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
তিনি আরও বলেন, রসরাজ সামান্য লেখাপড়া করেছে, ফেসবুকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে রসরাজ পোস্ট দিতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস হয় না। রসরাজকে ফাঁসানোর জন্য অন্য কেউ এ কাজ করেছে।
নাসিরনগরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. ছায়েদুল হকও এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রসরাজ দাস ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার ঐ ছবি আপলোড করেনি৷ গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছবিটি ঢাকা থেকে পোস্ট করা হয়েছে৷ কারা এই ছবিটি পোস্ট করেছে, তার তদন্তও চলছে৷ এই ছবিটি এখন ফরেনসিক ল্যাবে আছে৷ নাসিরনগরের দু-চারটা লোক এই ষড়যন্ত্র করছে৷
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে রসরাজ দাসের বাড়ি নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় সুনশান নিরবতা। শান্ত পশ্চিমপাড়ায় এখনো নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন বেশ কয়েকজন এপিবিএন সদস্য। গ্রামের মূল সড়কের গলির ভেতরের কয়েকটি বাড়ির পর রসরাজ দাসের বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের দরজার সামনে পড়ে রয়েছে রসরাজের পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করার একমাত্র অবলম্বন মাছ ধরার জালটি। 
এছাড়া ৩০ অক্টোবর সকালে হামলার শিকার হওয়া সেই বাড়িটিতে এখনো লেগে আছে দুর্বৃত্তদের করা ভাঙচুর আর লুটপাটের ছাপ। অবশ্য হামলার আগের দিনই রসরাজ ও তার চাচা জয়দেব দাসের পরিবারের লোকজন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। তবে তারা পালিয়ে কোথায় গেছেন সেটি বলতে পারছেন না কেউই।
পরদিন রোববার (৩০ অক্টোবর) সকালে দুষ্কৃতকারীরা পশ্চিমপাড়ায় হামলা চালিয়ে রসরাজের বাড়িসহ বেশ কয়েকটি ঘর-বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এ ঘটনার পর বেশ কয়েকটি পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর পালিয়ে বেড়ানো পরিবারগুলো গ্রামে ফিরে আসলেও রসরাজের পরিবারের সদস্যরা এখনো পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি।
রসরাজের প্রতিবেশী ঝর্ণা রাণী দাস জাগো নিউজ বলেন, গত শনিবার (২৯ অক্টোবর) রাজরাজকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর এদিন মধ্যরাতেই কাউকে কিছু না বলে রাসরাজ ও তার চাচা জয়দেব দাস তাদের পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তবে তারা কোথায় গেছে আমরা কেউ জানি না। আমরাও পরদিন রোববার হামলার পর বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে বুধবার বাড়িতে এসেছি।
আরেক প্রতিবেশী রঞ্জন দাস জাগো নিউজকে বলেন, রসরাজের পরিবারের সদস্যরা গ্রামের কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের কারো ফোন নম্বর না থাকায় আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।
রসরাজের পরিবারের সদস্যরা দেশে আছেন নাকি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, রসরাজের পরিবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। রোববার (৭ নভেম্বর) রসরাজের ছোট ভাই পলাশের মুঠোফোন ট্রেস করে সর্বশেষ অবস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী আখাউড়ায় পাওয়া গেছে।
তবে পরবর্তীতে তার ফোনটি বন্ধ থাকার কারণে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। রসরাজের পরিবারকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এফএ/পিআর