সাদিয়া টেক্সটাইলের গ্রাসে সরকারি খাল
বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কের পাশে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কদিমধল্যা-বানিয়ারা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ নামক প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো বৃদ্ধি করতে পাশের সরকারি খাল ভরাট ও জবরদখল করা হয়েছে।
এর ফলে আশপাশের ৪ গ্রামের কৃষকদের প্রায় ৮ হাজার একর ফসলি জমি পানির নিচে পড়েছে। জমিতে ফসল ফলাতে না পারায় স্থানীয় ৫ হাজার পরিবার অর্ধাহার- অনাহারে দিনাতিপাত করছে।
জানাগেছে, বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কের পাশে মির্জাপুর উপজেলার কদিমধল্যা-বানিয়ারা এলাকায় প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ওয়াদুদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ নামে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো বৃদ্ধি করা হয়। এক পর্যায়ে পাশের খাল ভরাট করে দখলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের জন্য রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ফলে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গোড়ান, বানিয়ারা, সাটিয়াচড়া ও কাটরা গ্রামের প্রায় ৮ হাজার একর ২-৩ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কের পাশে মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান, বানিয়ারা, সাটিয়াচড়া ও কাটরা গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের মূল পেশা কৃষি। কৃষি কাজের মাধ্যমেই তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এসব ফসলি জমিতে প্রতি বছরই ২-৩ ধরনের ফসল ফলাতেন গ্রামবাসীরা। ওইসব ফসলি জমির পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ ছিল ওই খালটি। 
কিন্তু খাল ভরাট ও দখল করে তাদের জীবন-জীবিকার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্। মহাসড়ক সংলগ্ন ওই ফসলি জমিগুলো দেখে মনে হয় এখনো বর্ষা মৌসুম। পানি শুকানোর কোনো লক্ষণই নেই। আবার অনেকে সেই ফসলি জমিতে এখনো ছোট ছোট নৌকা নিয়ে মাছ ধরার জন্য এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন।
স্থানীয়রা জানায়, টেক্সটাইলটি প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ওই খালের উপর ছোট পরিসরে একটি কালভার্ট নির্মাণ করে কাজ শুরু করলেও পরে মহাসড়ক চারলেন করণের কাজ শুরু হলে ছোট কালর্ভাটটি বন্ধ করে দেয়া হয় এবং খালের জায়গা দখল করে সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ যাতায়াতের জন্য দুটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ফলে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৮২ সালে মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান, বানিয়ারা, সাটিয়াচড়া ও কাটরা এলাকার কৃষকদের সুবিধার্থে খালটি খনন করা হয়। ওই খালটি খনন করায় প্রতি বছর বর্ষার পর পরই পানি নিষ্কাশন হয়ে ফসলি জমি চাষাবাদের উপযোগী হয়ে ওঠে। স্থানীয় কৃষকরা ওই খালের সুবিধা ভোগ করে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
কিন্তু সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ এর এহেন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে এখন স্থানীয় কৃষকরা জমি চাষাবাদ করতে পারছে না। এখন অভাব তাদের নিত্য সঙ্গী হয়েছে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে ভ্যান-রিকশা-ঠেলাগাড়ি ও দিনমজুরি করে অর্ধাহার- অনাহারে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। গোড়ান, বানিয়ারা, সাটিয়াচড়া ও কাটরা গ্রামের মানুষ স্থানীয় প্রশাসনে বার বার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায়নি।
কাটরা গ্রামের ফরহাদ আলী খান বলেন, এই যে পানি দেখছেন এখানে আমার ৩শ ৩৬ শতাংশ ফসলি জমি আছে। আমি প্রতিবছর এ জমিতে তিনটি ফসল চাষ করেছি। এক প্রভাবশালী জায়গা কিনে সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ নামে শিল্প-প্রতিষ্ঠান করেছে। খাল ভরাট করে দখলে নিয়েছে। ফলে জমিতে পানি আটকে আছে। আমাদের সমস্যাটা কারো চোখে পড়ে না।
৬শ ৬০ শতাংশ ফসলি জমির মালিক আব্দুল মান্নান বলেন, আমার বাপ-দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি চাষ করে সংসার চালাই। এ জমিতে আমরা মৌসুম ভিত্তিক ফসল চাষ করতাম, কিন্তু এখন কিছুই করতে পারছি না। সরকারি খাল ভরাট ও দখল করে শিল্প প্রতিষ্ঠান করার কারণে আমাদের জমি এখন পানির নিচে।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কৃষক আনোয়ার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, আমরা বউ-পোলাপান নিয়ে কী খাব! আমাদের তো কিছু করার নেই। যে জায়গা আছে তাতে তো আর ফসল ফলাতে পারবো না। একটি প্রতিষ্ঠানের অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে আমাদের আজ এই দশা। কেউ তো আমাদের কথা শুনছে না। অনেক সাংবাদিকই আসে, কিন্তু কিছুই তো করে না; আমাদের দোষ-ত্রুটি থাকলে তাও তুলে ধরুক। দিনরাত কাজ করে দু-বেলা খেয়ে বাঁচতে চাওয়াটাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি।
জামুর্কি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এজাজ খান চৌধুরী বলেন, যে সকল ফসলি জমি এখন পানির নিচে আছে তার মালিকরা আমাকে কোনো কিছুই জানায় নাই। যে সকল জমি পানিতে ডুবে আছে সেজন্য শুধু সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ই দায়ী নয় অন্য আরো কিছু প্রতিষ্ঠানও জড়িত। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে পারবো না।
সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ এর মালিক ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, আমি এ প্রতিষ্ঠানের মালিক না। এর মালিক সঞ্জিতা চৌধুরী। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন। আমরা কোনো জায়গা দখল করিনি, সরকারি খাল দখল করার তো প্রশ্নই আসে না। মহাসড়ক চারলেন হচ্ছে, তার কারণে পানি বের হতে পারছে না। এতে আমাদের কোনো হাত নেই।
এ বিষয়ে মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুমানা ইয়াসমিন বলেন, সাদিয়া টেক্সটাইল মিলস্ যদি সরকারি খাল দখল করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো সরকারি জমি দখল করতে দিব না। আর যে সকল ভূক্তভোগী কৃষক রয়েছে তারা যেন ঠিকভাবে চাষাবাদ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এফএ/জেআইএম