সিরাজগঞ্জে ফসলি জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমেছে
ক্ষতিকর পোকা দমনে এক সময় জমিতে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ব্যবহা করা হতো। এখন সেই প্রবণতা অনেকটা কমেছে। ধান ক্ষেতে এখন পোকা খেকো পাখি বসার ব্যবস্থা করে দমন করা হচ্ছে।
এসব কারণে শস্য ভাণ্ডারখ্যাত বৃহত্তর চলনবিলসহ সিরাজগঞ্জের কৃষকদের কাছে দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পোকা দমনের সহজ আর বিনা খরচার পরিবেশবান্ধব পার্চিং এবং আলোক ফাঁদ পদ্ধতির ব্যবহার।
সরেজমিনে জেলার বেশ কিছু মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জে সবুজ ধান ক্ষেত দেখলেই এখন চোখে পড়বে বাঁশের কঞ্চি, শুকনো ডালপালা অথবা সবুজ ধনছে গাছ। ধান ক্ষেতের মধ্যে কয়েক ফিট পরপর বাঁশের কঞ্চি পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও ক্ষেতের মাঝে ধনচে গাছ লাগানো হয়েছে। এগুলোতে ফিঙ্গে পাখি বসছে। খেয়ে ফেলছে ধানের ক্ষতিকর সব পোকা। বিশেষ করে দুপুরের পর সূর্যের তাপ কমে গেলে ধানের জমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পোকা খেকো পাখি বসছে। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠছে সবুজ ধান ক্ষেত। পাখিরা ক্ষেতের শুকনো ডালে বসে ধান গাছের ক্ষতিকর পোকা ধরে ধরে খেয়ে ফেলছে। সেই সঙ্গে ধনচে গাছ জমিতে সার তৈরি করছে।20170304182720.jpg)
একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমিতে সার দেয়ার পর থেকেই রোপা-আমন, ইরি-বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতে বাদামী ঘাসফড়িং বা কারেন্ট পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি-মাজরা পোকাসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এসব পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা কীটনাশক ওষুধসহ বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। বর্তমানে কৃষকরা ক্ষেতে কীটনাশক ওষুধ পরিহার করে পোকা দমনে সহজ ও পরিবেশবান্ধব পার্চিং এবং আলোক ফাঁদ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে জানা যায়, কৃষি বিভাগের নতুন উদ্ভাবিত এ পদ্ধতির নাম পার্চি। পার্চিং দুই ধরনের। একটি ডেড পার্চিং জমিতে শুকনো ডাল অথবা কঞ্চি পুঁতে দেয়া। আরেকটি জীবন্ত পার্চিং জমিতে ধনচে গাছ লাগানো। ইতোমধ্যে প্রতি বিঘা জমিতে ডেড পার্চিং ও জীবন্ত পার্চিং পদ্ধতির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।20170304182659.jpg)
এবার সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় ৫৬ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতি বিঘা জমিতে ডেড পার্চিং ও জীবন্ত পার্চিং পদ্ধতির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আমন ধান ক্ষেতে ৪২৫টি জমিতে পার্চিং পদ্ধতির আওতায় আলোক ফাঁদ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য জেলার প্রত্যেকটি ইউনিয়নে নিয়োজিত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের মাঝে কাজ করছেন।
কৃষিবিদদের মতে, ধান গাছে থোড় আসার পর লেদা পোকা, নলি মাছি, মাজরা পোকাসহ কয়েকটি পোকা আক্রমণ করে। পোকার আক্রমণে প্রতি বছর প্রায় সাত থেকে প্রায় ১০ ভাগ ধানের উৎপাদন কম হতো। এ ধরনের ক্ষতিকারক পোকা দমনে একসময় কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। এতে বিঘা প্রতি প্রায় দেড় হাজার টাকা বেশি খরচ হতো। সিরাজগঞ্জের কৃষকরা এখন কীটনাশকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পোকা দমন করছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচ ঠাকুরীর বর্গাচাষি আমজাদ হোসেন, রহিম, বক্করসহ অনেক কৃষক জানান, কৃষি অফিস আমাদেরকে পার্চিং পদ্ধতি বা ক্ষেতের ভেতর ডাল-পালা, বাশের কঞ্চি পুঁতে রাখা এবং সন্ধ্যার দিকে জমিতে আলোক ফাঁদ সম্পর্কে মাঝেমধ্যে উঠান বৈঠকের মাধমে সচেতন করেছেন এখনও অব্যাহত রেখেছেন। পার্চিং পদ্ধতি আগে কৃষক বুঝতে চাইতো না। এখন সবাই সচেতন। এখনও বিভিন্ন উঠান বৈঠকে এর সুফল তুলে ধরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।20170304182720.jpg)
তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের মানিকচার গ্রামের কৃষক আলহাজ আলী পার্চিং সম্পর্কে বলেন, এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে জমিতে ক্ষতিকারক পোকার হাত থেকে কীটনাশক ছাড়াই ফসলকে রক্ষা করা যায়। এ পদ্ধতি আমি গতবারও ব্যবহার করেছিলাম উপকার পেয়ে এবারও ব্যবহার করছি।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ক্ষেতের ভেতর ডালপালা পুঁতে রেখে পাখিদেরকে পোকা খাওয়ার সুযোগ করে দেয়াকেই পার্চিং পদ্ধতি বলে। আর সন্ধ্যার দিকে জমিতে ইলেকট্রিক বা ব্যাটারি চালিত বাল্ব একটি খুঁটির সঙ্গে লাগিয়ে জ্বালিয়ে রাখতে হয়। তারপর সেই বাল্বের নিচে সাবান মিশ্রিত পানি ভর্তি একটি গামলা রাখতে হয়। আলো পেয়ে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় সেখানে জড়ো হয় এবং গামলার ভিতর পড়ে মারা যায়। এতে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের উপস্থিতি আর দমন দুটোই সহজেই করা যায়।
এ পদ্ধতিগুলো পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। কৃষকদের অতিরিক্ত টাকা পয়সাও ব্যয় হয় না। প্রতি বিঘা জমিতে ৭/৮টি বাঁশের কঞ্চি বা ডালপালা পুঁতে পাখি বসার জায়গা করে দিলে পাখিরা ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড় খুব সহজেই খেয়ে ফেলে। ফলে পোকার আক্রোমণ থেকে ক্ষেত রক্ষা পায়। ক্ষতিকর পোকা মাকড় দমনের জন্য পরিবেশবান্ধব পার্চিং এবং আলোক ফাঁদ পদ্ধতি খুবই কার্যকর হওয়ায় কৃষকদের মাঝে দিনদিন এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান।
এমএএস/আরআইপি