চিকিৎসা চলে ঝাড়-ফুকে


প্রকাশিত: ০৪:১২ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০১৭

প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা না পাওয়ায় এখনও তাবিজ কবজ আর ঝাড়-ফুকেই চিকিৎসা চলছে উপকূলীয় এলাকার মানুষের। ফলে বিচ্ছিন্ন চর এলাকার নারী ও শিশুরা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসডিজি বাস্তবায়ন করতে এসব এলাকায় গুরুত্ব বিবেচনায় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন সরকারের বিশেষ প্রকল্প প্রণয়ন।

জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ২০৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৫৬টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রসহ জেলা ও উপজেলা শহরে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রয়েছে।

দেখা গেছে, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী, চর মন্তাজ, চর বিশ্বাস, চালিতাবুনিয়া, বড়বাইশদা, ছোটবাইশদা, চর বেস্টিন, চর মার্গারেট, চর আন্ডা, চন্দ্রদ্বীপসহ অন্তত অর্ধশত চর এলাকায় নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ। দুই একটি চরে কমিউনিটি ক্লিনিক অথবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও সেসব স্থানে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ পত্র। ফলে অনেকটা নামেমাত্র চলছে এসব সেবাকেন্দ্রগুলো।

অপরদিকে কোনো কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতেও টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ চরবাসীর।

রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়ার গৃহবধূ সুমাইয়া বলেন, পটুয়াখালী যাইতে লঞ্চ আর ট্রলারই আমাগো একমাত্র ভরসা। লঞ্চে গ্যালে খরচ কম অয় (হয়) আর ট্রলারে গ্যালে খরচ ও সময় বেশি লাগে। আমরা গরীব মানু (মানুষ) অতো টাহা পামু কই? আমার ভাবিরে বাঁচাইতে অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু পারি নাই।

স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালী উপজেলায় এভাবে বাঁচাতে গিয়ে মরতে হয়েছে কাজির হাওলা গ্রামের দুলাল লাহারীর স্ত্রী সালমা বেগম, ১৯নং রাঙ্গাবালী গ্রামের ফিরোজ মৃধার স্ত্রী নাসিমা বেগমসহ অগনিত রোগীর। এমনকি রাঙ্গাবালী থানা পুলিশের আফাজউদ্দিন নামে একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালী নেয়ার পথে ট্রলারেই মারা যান তিনি। গর্ভবতী মায়েদের ডেলিভারি করার জন্যও নেই কোনো উন্নত ব্যবস্থা।

বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরকচুয়া গ্রামে বসবাসকারী লাল বানু বলেন, ডাক্তার না থাহনের কারণে আমার পোলারে (ছেলে) হুজুরের কাছে নিছি। মানতি ছানতি করছি। হুজুরে তদবির দেলে গুরাগারা ভালো অয় (হয়)।

এসময় কথা হয় একইগ্রামের হেনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাগো এলাকায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে। তয় হ্যাতে ডাক্তার নাই। একজন স্যার আয় আমাগো সমস্যার কথা কই। আর হ্যারে টাকা দ্যাওনের পরে হ্যায় ওষুধ দেয়।

রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন জানান, উপজেলাবাসীর চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তা করে জরুরি ভিত্তিতে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা দরকার।

বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলকাছ মোল্লা বলেন, নিরুপায় এসব চরবাসী অনেক সময়ে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা অনুমোদিত ফার্মেসি কিংবা কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ সেবন করে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সরকারিভাবে বিচ্ছিন্ন এসব চরে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারলে কমবে মা ও শিশু মৃত্যুর পরিমাণ।

পটুয়াখালী সিভিল সার্জন মো. মেলিম মিয়া জানান, উপকূলের বিচ্ছিন্ন চরের মানুষদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা থাকবে না।

চরের এসব মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারলে স্বাস্থ্য সেবায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকেও দেশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হবে তেমনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবাও নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মহিব্বুল্লাহ্ চৌধুরী/এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।