কবি গুরুর ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী : স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুর


প্রকাশিত: ১১:২৪ এএম, ০৭ মে ২০১৫

২৫ বৈশাখ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে কবির স্মৃতি বিজড়িত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শাহজাদপুরে জাতীয় পর্যায়ের ৩ দিন ব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ২৫, ২৬, ২৭ বৈশাখ শাহজাদপুরে তিনদিন ব্যাপী নাটক, গীতি আলেখ্য, সঙ্গীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি, আলোচনা, প্রবন্ধ পাঠ বৈশাখী মেলা প্রভৃতি অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে।

এখন কুঠিবাড়িসহ আশপাশে চলছে ধোয়া-মোছার কাজ। এদিকে কবি গুরুর জন্ম জয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ দেবার ঘোষণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শাহজাদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। যে কারণে শাহজাদপুর এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে শাহজাদপুরে অনুষ্ঠিত হবে ৩ দিন ব্যাপী রবীন্দ্র মেলা।

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিরাজগঞ্জের শাজাদপুরে এসেছেন বেশ কয়েকবার। এখানে অবস্থানকালে কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্পসহ কত অমর রচনাবলী তিনি লিখেছেন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌর এলাকার দিলরুবা বাসস্ট্যান্ড থেকে সামান্য দূরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি।

কবির পূর্ব পুরুষরা তাদের শাহজাদপুরের জমিদারি পরিচালনা করতেন। ইংরেজ নীলকরদের কাছ থেকে ভবনটি কিনে নেয়ায় তা কুঠিবাড়ি হিসেবেও পরিচিত। বর্তমানে কবির পরশ ধন্য এই বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর দায়িত্ব নিয়েছেন। এই ভবন চত্বরে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে রবীন্দ্র অডিটরিয়াম। কুঠিবাড়ির দক্ষিণ দিকে ছিল করতোয়া নদীর একটি শাখা। কবি গুরু এই নদী দিয়ে তার বোট ‘চিত্রা’ ও ‘পদ্মা’ নিয়ে যাতায়াত করতেন। এখন সেই নদী আর নেই। নদী ভরাট করে দিয়ে কাছারি বাড়ির প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে।

তিন তৌজির অর্ন্তগত ডিহি শাজাদপুরে জমিদারির আগে নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারীর অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারি নিলামে উঠলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দারকানাথ ঠাকুর মাত্র তের টাকা দশ আনায় এই জমিদারি কিনে নেন। জমিদারির সঙ্গে সঙ্গে এখানকার কাচারি বাড়ি ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়। এর পূর্বে কাছারিবাড়ির মালিক ছিল নীলকর সাহেবরা। ১৮৯০-১৮৯৬ পযর্ন্ত একাধিকবার কবি জমিদারি দেখাশুনার জন্য শাহজাদপুরে এসেছেন। শাহজাদপুরের মনোরম ও প্রকৃতির মুগ্ধতার টানে কবি বার বার এখানে এসেছেন।

১৮৯০ সালে প্রথম কবিগুরু শাহজাদপুরে এসেছিলেন তাদের জমিদারি দেখাশোনা করতে। তখনও সিরাজগঞ্জ-ঈশ্বরদী রেলপথ স্থাপিত হয়নি। তিনি আসতেন কোলকাতা থেকে ট্রেনে সাড়াঘাট অর্থাৎ পাকশী স্টেশনে। সেখান থেকে শাহজাদপুর আসতেন তার বোট ‘পদ্মা’ কিংবা ‘চিত্রায়’ চড়ে। অবশ্য ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উল্লাপাড়া স্টেশন থেকে পালকিতে চড়ে যাতায়াত করেছেন। তবে ১৯০১ সালের পর রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুরে আসার আর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এখানে তিনি পায়ে হেঁটে, পালকি ও নৌকা যোগে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শাহজাদপুরের প্রকৃতিকে ভালবেসে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে হৃদয় উজাড় করে দিয়ে সৃষ্টি করেছেন দূর্লভ কিছু সাহিত্য। পোস্ট মাস্টার গল্পের `রতন` চরিত্র তার শাহজাদপুরে বসেই সৃষ্টি। এখানে বসেই তিনি সোনারতরী, বৈষ্ণব কবিতা, দুইপাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয়, যমুনা, ভরা ভাদুরে, প্রত্যাখ্যান ও লজ্জাসহ নানা রচনা করছেন। চিত্রা, শীতেও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে এবং চৈত্রালির ২৮টি কবিতা, ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ অমর নাটক বিসর্জন তিনি শাহজাদপুরে বসেই রচনা করেছেন।

কবিগুরুর স্মৃতি চিহ্ন ছড়ানো এই কাচারি বাড়িতে এখন রয়েছে মনোমুগ্ধকর শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। বাহারি নানা ফুল গাছ আর লতাপাতায় সাজানো হয়েছে আঙিনা। সংস্কার করা হয়েছে কবির ব্যবহৃত দ্বিতল ভবনটিও। এক সময়ে এই ভবন সংলগ্ন একটি পোস্ট অফিস থাকলেও তার চিহ্ন আর নেই। যা ঘিরেই তিনি ছোট গল্প পোস্টমাস্টার রচনা করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তিনি কাচারি বাড়িটিকে সাজিয়ে ছিলেন প্রকৃতির রাজ্যরূপে। তিনি অসংখ্য গাছপালা রোপণ করেছিলেন এখানে। তার স্বহস্তে রোপণ করা একটি বকুল গাছ কয়েক বছর আগেও কবির স্মৃতি বহন করলেও এখন আর নেই। তবে সেই স্থানে নতুন একটি বকুল গাছ রোপন করা হয়েছে। এখানকার অজস্র পাখির কলতান আর অসাধারণ নৈসার্গিক পরিবেশে জেগে উঠতো তার কাব্যিক চেতনা। বিমোহিত হতেন এখানকার প্রকৃতির সৌন্দর্য্যতা দেখে।

বর্তমানে কাচারি বাড়িতে সংরক্ষণ করা কবির ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র এখনও কবির স্মৃতিকে আকড়ে ধরে আছে। বর্তমানে এখানে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত খাট, পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, আলনা, পিয়ানো, পালকিসহ বেশকিছু তৈজসপত্র রয়েছে। আরো রয়েছে কবির ২২টি প্রতিকৃতি ও নিজের আঁকা ২০টি ছবি।

কবির স্মৃতিচিহ্ন ভরা এই কাচারি বাড়ি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার দর্শনার্থী দর্শনীর বিনিময়ে কাচারি বাড়ি দেখতে এলেও সামান্যতম সুবিধাও তাদের নেই। মিউজিয়াম দেখতে আসা একাধিক দর্শনার্থীরা জানান, মিউজিয়াম সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট থাকলেও দর্শনার্থীদের ব্যাপারে তারা উদাসীন। দর্শনীর বিনিময়ে আগ্রহী মানুষেরা দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসলেও তাদের জন্য নেই কোন বসবার স্থান।

প্রতিবছরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় শাহজাদপুর কাছারি বাড়িতে। কিন্তু এবছর উৎসবের আমেজ অনেকটাই বেশী। সরকারিভাবে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে কাছারিবাড়ির অডিটোরিয়ামে। আর ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে প্রধানমন্ত্রীর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের বিষিয়টি। জাতীয় শিল্পীদের পাশাপাশি স্থানীয়রা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। জাতীয়ভাবে অনুষ্ঠানের কারণে স্থানীয় শিল্পীরা এখন দিনভর অনুশীলনে ব্যস্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে রবীন্দ্র মেলাকে সামনে রেখে অনেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন মেলায়। মেলায় পসরা সাজাতে তারাও ব্যস্ত। বরীন্দ্র জন্ম জয়ন্তী ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুরে এখন সাজ সাজ রব। প্রতি বছর পচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন দর্শনার্থীরা। কবির জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী শাহজাদপুর থাকবে মানুষের কলোতানে মুখরিত।

বাদল ভৌমিক/এমজেড/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।