সিরাজগঞ্জে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েই চলছে


প্রকাশিত: ০৮:০৯ এএম, ১২ মে ২০১৫

অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে গিয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ে সিরাজগঞ্জের অনেক যুবক এখন নিখোঁজ। বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার কিছু দিন পর মোবাইল ফোনে তাদের করুণ আকুতি শুনিয়েছেন সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। আবার অনেক পরিবার তাদের প্রিয় সন্তানের কোন হদিস পাচ্ছেন না। সন্তানের মঙ্গলার্থে একমাত্র সম্বল জমি জমা বিক্রি করে সেই টাকা দালালদের হাতে তুলে দিলেও সন্তানদের খোঁজ না পেয়ে এসব পরিবারগুলো এখন দিশেহারা।

প্রিয় সন্তান এখন কোথায় কীভাবে আছে তা তারা জানেন না। দিন দিন নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণ জঙ্গলে গণকবরের সংবাদ শুনে অনেক পরিবার তাদের সন্তান হারানোর আশঙ্কায় দিনভর আহাজারি করে চলেছেন। তাদের এই বুক ফাটা আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠছে এলাকার আকাশ বাতাস।

মালয়েশিয়া থেকে অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার সরল মানুষ দালালদের খপ্পরে পড়ে যান। সংসার একটু ভালো চলবে সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ উজ্জলের কথা চিন্তা করে তারা দালালদের বিশ্বাস করে ট্রলারে চেপে রওনা হন মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। অনেকে মালয়েশিয়া পৌঁছলেও বেশিরভাগের কপালে জুটেছে ঘোর অমানিশা। অনেকের স্থান থাইল্যান্ডের কারাগারে হলেও অনেকের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যায়নি। তবে ট্রলার থেকে অনেককে সাগরে ফেলে দেয়াসহ থাইল্যান্ড সীমান্ত এলাকার গভীর অরণ্যে হত্যা করে মরদেহ পুঁতে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। যে কারণে অনেক পরিবারই এখন তাদের সন্তানের কোন খোঁজ পাচ্ছেন না।

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার রুপনাই ও গাছপাড়া গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, এই দুটি গ্রামের শাহ আলম, ফুলজার, সুলতান মোল্লা ও আলমগীর হোসন পবন নিখোঁজ। তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা সকলেই তাঁত শ্রমিক। তাঁতের বাজার মন্দা হওয়ায় বিভিন্ন এনজিও ও সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে স্থানীয় দালাল আব্দুল আওয়ালের হাতে জন প্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে ট্রলারে চরে রওনা করেছিল মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। এরপর থেকে এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের আর কোন খোঁজ পাননি তাদের পরিবার।

বিষয়টি নিয়ে এনায়েতপুর থানায় মামলা হলেও তার অগ্রগতি নেই বললেই চলে। বর্তমানে থাইল্যান্ডের দক্ষিণ জঙ্গলে গণকবরের কথা টেলিভিশনে দেখে স্বজনদের দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে। অজানা আশঙ্কায় এখন তাদের নির্ঘুম রাত পার করতে হচ্ছে। এদিকে, মামলা হলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে অনেক পরিবার। এনায়েতপুর থানা পুলিশ আসামি আটক করলেও উৎকোচের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন।

সুলতান মােল্লার মা সালেহা খাতুন জাগো নিউজকে জানান, দালাল আওয়াল তার ছেলেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মালয়েশিয়া যাবার কথা বলে গত বছর বাড়ি থেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে সুলতানের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে আওয়াল তার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করলে তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ছেলেকে ফিরে পেতে তিনি থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে তিনি আদালতে মামলা দায়েরের পর আসামিকে আটক করলেও পুলিশ পরে তাদের ছেড়ে দেয়।

এ ব্যাপারে এনায়েতপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মাজেদ জাগো নিউজকে জানান, তিনি সবেমাত্র এই থানায় যোগদান করেছেন। তার আগে মামলার তদন্ত করেছেন বর্তমানে সিরাজগঞ্জ সদর থানার এসআই আব্দুল বারেক। মামলার তদন্তে আসামিদের কাছ থেকে টাকা নেবার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন।

এদিকে শাহজাদপুর উপজেলার রতনকান্দি গ্রামের কলেজ পড়ুয়া আলামিন গত ২ মাস যাবৎ নিখোঁজ রয়েছে। আলআমিনের বাবা শামসুল হক সরকার জাগো নিউজকে জানান, রতনকান্দি দক্ষিণপাড়া গ্রামের জয়েন উদ্দিন সরকারের ছেলে পাচারকারী রাজু তার ছেলে আলআমিন ও তার বন্ধু তৈয়ব আলীকে মালয়েশিয়া যাবার লোভ দেখিয়ে গত ১০ মার্চ চট্টগ্রাম নিয়ে যান। পরে রাজু দুই পরিবারের কাছে তাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এর মধ্যে তৈয়বের বাবা ৫ লাখ টাকা প্রদান করলেও তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করেন। পরে তৈয়বকে মালয়েশিয়া পাঠানো হলেও সেই থেকে আলআমিন নিখোঁজ রয়েছে। তার ধারণা, টাকা প্রদান না করায় তার ছেলেকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি আদা একটি মামলা দায়ের করেছেন।

শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহব উদ্দিন জাগো নিউজকে জানান, আল আমিনের বাবা শামসুল হক নারী ও শিশু আদালতে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেছেন। আদালত থেকে মামলাটি তদন্ত করার নির্দেশনা তিনি পেয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করা হচ্ছে।

দিন দিন নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ৪ থেকে ৫শ যুবক এখন এই দালালদের খপ্পরে পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের সুখের কথা চিন্তা করে জেলার যুবকেরা পাড়ি জমাতে চেয়েছিলো মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সে আশা দূরের কথা তাদের জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়াই এখন দায়। বিষয়টি নজরে এনে সরকার তাদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন এমনটাই আবেদন করছেন ভুক্তভোগী পরিবারে সদস্যরা।

বাদল ভৌমিক/এমজেড/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।