তালের ডিঙি বেয়ে স্কুলে যেতে হয় তাদের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পটুয়াখালী
প্রকাশিত: ১১:১৩ এএম, ০২ আগস্ট ২০১৭

তারা পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থী। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ৬৬ নং দক্ষিণ দ্বিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব দুই কিলোমিটার। বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তাদের নেই কোনো ভালো সড়ক কিংবা ব্রিজ-কালভার্ট।

বর্ষাকালে প্রায় এক কিলোমিটার পানিপথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে আরও এক কিলোমিটার তাদের হাঁটতে হয়। শুকনা মৌসুমেও পেরোতে হয় নদী। তাই লগি-বৈঠায় তালের নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ে যায় এসব শিক্ষার্থী।

উপজেলার ৬৬ নং দক্ষিণ দ্বিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শহরের শীর্ষ বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অজপাড়া গাঁয়ের এ বিদ্যালয়টি শতভাগ ভালো ফলাফল অর্জন করছে। কিন্তু রাস্তা-পুল-কালভার্ট এবং ভবনের অভাবে দিনকে দিন কমছে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই বিদ্যালয়ের দেখভালের কথা যাদের, তারা শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছেন। ফলে কোনোভাবেই এই বিদ্যালয়ের সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন দ্রুত সমস্যা সমাধান হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়বে।

বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, ৬৬ নং দক্ষিণ দ্বিপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ছাদ ধসে শিক্ষার্থীরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও রেহাই পায়নি নাজমুন্নাহার নামের ওই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। ছাদ ধসে তিনি গুরুতর আহত হন।

এরপরে বিদ্যালয়ের একমাত্র পাকা ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। ফলে পুরোনো একটি টিনসেট ভবন সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসিয়ে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণ করতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৫০ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির (শিশু শ্রেণি) ক্লাস হয় বাইরে। বৃষ্টি হলে তাও আবার বন্ধ করে দেয়া হয়। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ২০১০ সাল থেকে ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভেঙে নতুন একটি ভবন নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।

বিষয়টির সমাধানের জন্য বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি স্থানীয় এমপি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউপি মদনপুরা ইউপি চেয়ারম্যান সকলের কাছে গেছেন। কিন্তু আজো কোনো সমাধান হয়নি।

Patuakhali

এদিকে, বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে আলুতলার খাল নামে পরিচিত ওই খালের রাস্তা ভেঙে গেছে। খালের ওপর তালুকদার বাড়ির সামনের পুলটিও ভাঙা। সেই সঙ্গে স্লিপার না থাকায় ভিমের ওপর দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয় শিশু শিক্ষার্থীদের। এতে খালে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় শিক্ষার্থীরা।

এ অবস্থায় উপায় না পেয়ে তালের ডিঙি (তাল গাছের নৌকা) নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করছে শিক্ষার্থীরা। মাঝেমধ্যে নৌকা ডুবে ঘটে দুর্ঘটনা। তবুও বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তালের নৌকাই তাদের এখন ভরসার স্থল।

জানতে চাইলে একাধিক অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান খুবই ভালো। অজপাড়া গাঁয়ের শিক্ষার্থীদের আলোকিত করতে সবসময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। প্রতি বছর অন্যান্য বিদ্যালয়ের তুলনায় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফল ভালো হয়।

এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন ও তানজিলার ভাষ্য, আমরা লেখাপড়া করতে চাই। রাস্তা, পুল আর নতুন স্কুল হলে আমাগো লেখাপড়া করতে আর সমস্যা হইবে না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রাস্তা, পুল এবং ভবনের অভাবে আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে গেছে। কিন্তু শিক্ষার মানের দিক থেকে আমরা উপজেলার শহরের শীর্ষ বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে অনেক ভালো ফল করছি। সমস্যা সমাধান হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি প্রভাষক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খাল পাড়ের রাস্তা আর পুলের স্লিপার দেয়া হলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে কষ্ট হবে না।

বাউফল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজুল হক বলেন, ভবন পাওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও বরাদ্দ পাইনি। বরাদ্দ পেলে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে।

বাউফল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মজিবুর রহমান বলেন, পুল এবং রাস্তা মেরামতের জন্য উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেব।

মহিব্বুল্লাহ্ চৌধুরী/এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।