নীলফামারীর দেড় লাখ মানুষের ঈদ আনন্দ ম্লান

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নীলফামারী
প্রকাশিত: ০১:৩১ পিএম, ৩০ আগস্ট ২০১৭

‘গেল বার বন্যাত তাও কষ্ট করি কোরবানি দিতে পারছি। এবার আর কোনোভাবে দেয়া যায়ছে না। এ্যালাও বাঁধের উপরোত ছোয়া-ছোট নিয়া ত্রিপল টাঙ্গি আছি। বাড়িঘর ঠিক করির পাই না। হামরা গেছি ব্যাহে’।

বুকভরা কষ্ট নিয়ে এভাবেই মনের কথাগুলো বলেন তিস্তা নদী বেষ্টিত নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা গ্রামের রবি মিয়ার ছেলে রমজান আলী (৫৫)।

গত ১৩ আগস্ট বন্যায় বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে কলম্বিয়া বাঁধের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে দিনযাপন করছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।

তিনি বলেন, ৫ বিঘা জমিত (জমিতে) আমন আবাদ নাগানু (লাগানো) কিন্তু খেতটাও নষ্ট হয়া গেলো। হামরা এ্যালা কেংকরি (কেমন) চলি। টাকা অভাবে ভাঙা ঘরটা ঠিক করিবার পাইছি না তো।

তিস্তা পাড়ের খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বাইশপুকুর গ্রামের দিনমজুর মফিজুল ইসলাম (৬০) বলেন, গতবার ৫ হাজার করি টাকা দিয়া ৭ জনে কোরবানি দিছোনো (দিয়েছি)। এইবার পারা যায়ছে না। হাতের অবস্থা খুব খারাপ। সংসারের খরচই যোগান দেয়া কষ্টকর। কোনো রকমে ছোট একটা দোকান দিয়া চলছি।

তিস্তাপাড়ে ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়ন ঘুরে এমন কষ্টের চিত্রই পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক বন্যা কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বপ্ন। বেঁচে থাকার জন্য নতুন করে সংগ্রাম করছেন তারা। এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে পানি সরে গেলেও ক্ষত রেখে গেছে মানুষের হৃদয়ে। ঈদ সামনে আসায় আনন্দ যেন মলিন হয়ে গেছে এলাকার মানুষদের। ঈদ নিয়ে নেই তাদের অনুভুতিও।

খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ডালিয়া গ্রামের মরিয়ম মেগম (৪০) জানান, বাড়িতে পানি নেই ঠিকই। কিন্তু ঘর ভেঙে গেছে। যার কারণে ত্রিপল টাঙিয়ে বাইরে বসবাস করছি। ছেলে দুইটা কলেজে পড়ে। অনেক টাকার দরকার হয়। তার ওপরে বন্যা। অভাবির সংসারে কিসের আবার ঈদ।

হামার গরীবের মানষের কি আর ঈদ আছে প্রশ্ন করে মরিয়ম বলেন, ঠিক মতন নিন পারিবার পাইছি না, কেমন করি কোরবানি দেই।

nilpamary-flood

কলম্বিয়া বাঁধে আশ্রয় নেয়া রেহানা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, খালি ২০ কেজি চাল পাইছি আর শুকনা খাবার। সরকারসহ বিভিন্ন উদ্যোগে এলাকার জন্য শুনছি অনেক কিছু দেয়া হয়ছে। এ ত্রাণ ঠিক মতো সবাই পায় না।

টানাটানির কারণে ঘর মেরামত করতে সময় লাগছে মন্তব্য করে বন্যা আক্রান্ত লাভলী বলেন, বান না হইলে এইবার কোরবানি দিয়ন যাইত। কিন্তু আর হইল না।

বন্যার্তদের দুঃখ দুর্দশার কথা স্বীকার করে খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার বলেন, আমার ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সবাইকে দিতে না পারলেও ১ হাজার ৫০ পরিবারে সরকারি সহায়তা দেয়া হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল ও শুকনা খাবার দেয়া হয়েছে।

শুধু তিস্তা পাড়ের মানুষরাই নয় বন্যা ভাবিয়ে তুলেছে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দেড় লাখেরও বেশি মানুষকে। জেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ৫৩৫টি পরিবারের ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৪০ জন মানুষকে বন্যার ধকল সামলাতে হচ্ছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, তিস্তার বাধে আশ্রিত প্রতিটি পরিবারকে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ত্রাণ দেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসক বাঁধ দুইটি তৈরি করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে একটি বাঁধ তৈরি হলেও অন্যটি চলমান রয়েছে।

এছাড়া পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৮ হাজার ৬৬৫ পরিবারকে দুই দফায় ২০ কেজি চাল ও সরকারিভাবে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্র জানায়, ১ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন চাল, ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫২৫ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৬ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয় বন্যাদুর্গতদের মাঝে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবু তাহের মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা প্রণয়ন করে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রেরণ করেছি। পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ আসলে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যক্রম শুরু হবে।

তিনি জানান, ৫ কিলোমিটার বাঁধ, পাকা রাস্তা ২৩০ কিলোমিটার, কাঁচা রাস্তা ৩০৬ কিলোমিটার, ১৪০টি ব্রিজ-কালভার্ট, ৩৮ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ফসল, ১৩ হাজার ৬৩টি গবাদি পশু, ১১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ১ হাজার ৮৪টি নলকূপ ও ৪ হাজার ৮টি ল্যাট্রিন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বন্যায়। এছাড়া ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জাহেদুল ইসলাম জাহিদ/এএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।