মির্জাপুরে চার স্তরে চলে মাদক ব্যবসা
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার শতাধিক পয়েন্টে চার স্তরে চলে মাদক ব্যবসা। গত ১৩ দিনে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাদক সেবন, বিক্রি ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় ৭৩ জনকে গ্রেফতার করলেও মূল হোতারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মির্জাপুর থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে থানা পুলিশ ১২০ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। এর মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাবেক ইউপি সদস্য ও কাউন্সিলর, সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা ও বিএনপি সমর্থিত কয়েকজন নেতার নামও রয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় মির্জাপুরে চলছে রমরমা মাদক ব্যবসা।
কয়েক মাদকসেবী জানিয়েছেন, উপজেলায় ইয়াবাসহ ও বিভিন্ন মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের ছত্রছায়ায় এলাকাভিত্তিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে অন্তত ৩০ জন মাদক বিক্রেতা।
আর তাদের কাছ থেকে ইয়াবা ক্রয় করে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করছে প্রায় দুইশ মাদক বিক্রেতা। খুচরা এ বিক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ৫০ জন নারী বিক্রেতা। এসব হয় মুঠোফোনের মাধ্যমে। এ চক্রে রয়েছে পৌর কাউন্সিলর, সাবেক কাউন্সিলর ও কয়েকজন ইউপি সদস্য। এভাবে মোট চার স্তরে পরিচালিত হয় মাদক ব্যবসা।
সড়ক ও রেল পথে উত্তরাঞ্চল ও ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেনে মাদকের চালান প্রবেশ করছে মির্জাপুরে। পুলিশের তৎপরতা সত্ত্বেও থেমে নেই মরণঘাতী এই ইয়াবার ব্যবসা। রিকশাচালক, মোটরসাইকেল চালক, ডাব বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতার ছদ্মবেশে ইয়াবা ও হেরোইন বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।
মোবাইলে দরদাম ঠিক করে বিকাশের মাধ্যমে কিংবা নগদ লেনদেন সম্পন্ন করার পর খুচরা বিক্রেতাদের কথা অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে এসে অপেক্ষা করে মাদকসেবীরা।
এরপর খুচরা বিক্রেতারা ইয়াবা ও হেরোইন পৌঁছে দেয় অপেক্ষমাণ মাদকসেবীদের হাতে। পুলিশি অভিযানের কারণে বর্তমানে স্থান আর কৌশল পাল্টে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এই মাদক ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, মাদক সেবন করে এ উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী যুবকরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এ মাদক ক্রয়ের টাকার জন্য বেড়েছে নানা ধরনের অপরাধও।
টাকার জন্য তারা বাবা-মাকে মারধর করা ও বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। লোকলজ্জার ভয়ে অভিভাবকরা তা প্রকাশ করতেও পারছেন না। দিন দিন পারিবারিক কলহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাদকসেবী ছেলের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন।
গত ১৭ মে থেকে মির্জাপুর থানা পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। গত ১৩ দিনে মির্জাপুর থানা পুলিশ ৭৩ জনকে গ্রেফতার করে। তবে মূল হোতারা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ ওয়াহিদ ইকবাল বলেন, মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। পুলিশের তালিকায় মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী হিসেবে যাদের নাম প্রথম সারিতে রয়েছে তারাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মির্জাপুর থানা পুলিশের (ওসি) এ কে এম মিজানুল হক বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের কাউকেই ছাড়া হয়নি। প্রথম রমজান থেকে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। মাদকবিক্রি, সেবন, ছিনতাই এবং ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ১৩ দিনে ৭৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদক ব্যবসার মূল হোতাদেরকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এস এম এরশাদ/এএম/জেআইএম