ঈদের দিন স্বজনদের অপেক্ষায় ছিলেন প্রবীণরা, কিন্তু
গাজীপুরে প্রবীণ নিবাসে স্বজনদের অপেক্ষাতেই ঈদ কাটে নিবাসীদের। যে সন্তানদের কোলে পিঠে করে মানুষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জীবনে অন্তত ৩০-৩৫টি ঈদ উদযাপন করেছেন সন্তানদের নিয়ে। সোনালি দিনগুলো সন্তাদের নিয়ে পার করেছেন। নিজ হাতে সন্তানদের সাজিয়ে দিতেন। সকালে মায়ের হাতে রান্না করা সেমাই খেয়ে বাবার সঙ্গে ঈদগাহে নামাজ পড়তে গেছে সন্তান। ঈদে নিজের জন্য কিছু না কিনে সন্তানকে কিনে দিয়েছেন।
নিজের জমানো টাকা দিয়ে জামা জুতা কিনে সন্তানের আবদার রক্ষা করেছেন। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ ঈদের দিনে এগুলো কেবলই স্মৃতি। প্রবীণ নিবাসে থেকে ঈদের সারাদিন প্রতীক্ষা করেছেন প্রিয় সন্তান আসবে তাকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি সন্তান ও স্বজনদের কেউ আসেনি দেখতে। রাতে একরাশ হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে ঘুমিয়ে পার করেছেন ঈদের দিনটি।
ঈদে তারা নিবাসী কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন নতুন কাপড় আর ভালো খাবার। কিন্তু বুকের ভেতরে যে আকাঙ্ক্ষা প্রিয় স্বজনদের দেখা পাওয়া, সেই স্বাদ তাদের মিটেনি। অধিকাংশ নিবাসীই তাদের স্বজনদের সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় থাকলেও আত্মীয়-স্বজন বা প্রিয় মানুষটির দেখা পাননি।
বেশ কয়েকজন নিবাসী তাদের স্বজনদের সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন স্মৃতিস্মরণ করে আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। অনেকেই আবার নিজের পরিবার, স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের স্মরণ করে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। আবার কেউ চরম দুঃখে এবং ক্ষোভে স্বজনদের নামও মুখে আনতে চাননি। তারপরও সন্তানদের অমঙ্গল চান না কেউ।
ঈদের পরদিন রোববার বিকেলে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর বিকেবাড়ী এলাকায় অবস্থিত গিভেন্সী গ্রুপের পরিচালনাধীন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে বৃদ্ধ নিবাসীদের সঙ্গে কথা বললে ওঠে আসে তাদের নানা স্মৃতির নানান কাহিনি।
নরসিংদীর রায়পুরা থানার আব্দুল্লাপুর এলাকার শামসুর রহমান (৬৫) ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট থেকে এ কেন্দ্রে নিবাসী হয়ে আছেন। তার এক ছেলে তিন মেয়ে। সর্ব কনিষ্ঠ মেয়ে ছাড়া সব সন্তানের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। কেন্দ্রের নিবাসীদের আশ্রয় কেন্দ্রের বারান্দায় কান্না জড়িত কণ্ঠে শামসুর রহমান বলেন, এক সময় তিনি বাংলাদেশ স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনে চাকরি করতেন। চাকরিকালীন সময় হঠাৎ তিনি প্যারালাইসিস অসুস্থ হয়ে উপার্জন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
তিনি জানান, তার একমাত্র ছেলে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে সে বান্দরবান জেলায় বদলি হয়েছেন বলে জানান। গত দুই বছরে এই ছেলে শুধু একবার এ নিবাসে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। দীর্ঘ এক বছর ধরে তার কোন সন্তান দেখা করতে আসেননি।
তিনি আরও জানান, তার আত্মীয় স্বজনরা গ্রামের বাড়িতে জমি-জমা বেদখল করে রেখেছে। মনের দুঃখে তিনি নিজে একাই এ কেন্দ্রে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এবারের ঈদে তিনি আশা করেছিলেন তার সন্তানরা হয়তো দেখা করতে আসবে। কিন্তু কেউ আসেনি। শামসুর রহমান জানান, ঈদ উপলক্ষে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাকে একটি লুঙ্গি ও সার্ট দিয়েছেন। এছাড়াও ভালো খাবারও দিয়েছেন। এতে তিনি সন্তুষ্ট।

কুমিল্লার মুরাদনগর থানার জানগড় এলাকার মৃত সিদ্দিুকুর রহমানের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৭৫)। তিনি প্রায় ৪ বছর যাবৎ এ কেন্দ্রের নিবাসী। বৃদ্ধা এ নারী জানান, প্রায় ২০ বছর পূর্বে তার স্বামী মারা গেছেন। তার স্বামী এক সময় বিমান বাহিনীতে চাকরি করতেন। তার তিন ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে গত বছর মারা গেছে। ওই সময় ছেলেকে দেখতে এ কেন্দ্র থেকে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তার অন্য সন্তানরা কেউ ঈদের পর থেকে এ পর্যন্ত দেখা করতে আসেনি বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, স্বামীর রেখে যাওয়া টাকা-পয়সা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে তার বিবাদ হয়। এক পর্যায়ে চরম দুঃখে ও কষ্টে অন্য এক লোকের মাধ্যমে এই কেন্দ্রে এসে আশ্রয় নেন। প্রায় চার বছর পার হয়ে গেলেও স্বজনরা কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। ঈদের দিন সকালে সেমাই-মুড়ি, খিচুড়ি এবং দুপুরে পোলাও মুরগির মাংস, দই-মিষ্টি খেয়েছেন। তার বড় আশা ছিল অন্তত ঈদের দিন সন্তানরা কেউ তাকে দেখতে আসবে। কিন্তু তার সেই আশা পূরণ হলো না বলে তার আক্ষেপের অন্ত নেই। ঈদের দিন প্রতিটা মুহূর্তে তিনি সন্তানদের প্রতীক্ষায় ছিলেন। এই বুঝি তারা কেউ দেখা করতে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ দেখা করতে আসেনি।
ঈদে কি উপহার পেলেন আর কি খেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে সব সময় ভালো খাবার দেয়া হয়। ঈদে কর্তৃপক্ষ নতুন শাড়ি, ব্লাউজ ও পেটিকোট দিয়েছেন। সকালে সেমাই-মুড়ি, দুপুরে ও রাতে পোলাও-ভাত মাংস খেতে দিয়েছেন।
গাজীপুর সদর উপজেলার বিশিয়া কুড়িবাড়ী মৌজায় ৭২ বিঘা জমি নিয়ে ১৯৯৪ সালে ষাটোর্ধ্ব অবহেলিত, উপার্জনে অক্ষম ও সহায়সম্বলহীন প্রবীণদের আমৃত্যু আশ্রয়, খাবার, বস্ত্র ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে গিভেন্সী গ্রুপের মালিক খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল কেন্দ্রটি নির্মাণ করেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে হোতাপাড়া-মনিপুর সড়কে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় ওই পুণর্বাসন কেন্দ্রে।
কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক আবু শরিফ জাগো নিউজকে জানান, এখানে ২০০ জন নিবাসী রয়েছেন। এদের মধ্যে ১০৩ জন বৃদ্ধ এবং ৯৭ জন বৃদ্ধা। এবারের ঈদে ৩৪ জন বৃদ্ধ এবং ১৬ জন বৃদ্ধা ১০ দিনের ছুটিতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে তাদের গ্রামের বাড়িতে গেছেন।
তিনি জানান, এবার কেন্দ্রের মসজিদে ঈদের একটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদে পুরুষের জন্য পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি দেয়া হয়েছে। মহিলাদের জন্য শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট ও ম্যাক্সি দেয়া হয়েছে। ঈদের দিন সকালে সেমাই-মুড়ি, খিচুরি এবং দুপুরে ও রাতে পোলাও-সাদা ভাত, গরু ও মুরগির মাংস দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই কেন্দ্রের নিবাসীদের দেখভালের জন্য ৫৩ জন স্টাফ রয়েছেন। এছাড়া একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, দুইজন প্যাথলজিক্যাল টেকনিশিয়ান, একজন ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসক ও একজন নার্স নিবাসীদের চিকিৎসা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। তাছাড়া নিবাসীদের টিভি দেখার জন্য হলরুম, মহিলা ও পুরুষদের জন্য আলাদা ডাইনিং, মসজিদ, হিন্দু-মুসলিম ও খ্রিষ্টান ধর্মের প্রবীণ ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের স্ব স্ব ধর্মমতে শেষ কার্য সম্পন্ন করে আলাদাভাবে সমাধি দেবার ব্যবস্থা রয়েছে। ঈদের দিন নিবাসে অবস্থান করা নিবাসীদের মধ্যে ৫/৬ জনের স্বজনরা দেখা করতে এসেছিলেন।
আমিনুল ইসলাম/এমএএস/এমএস