সোনালি স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে কৃষকের পাট
চারিদিকে তাকালেই দেখা মিলছে সবুজের সমাহার। বিস্তৃর্ন মাঠ জুড়ে সোনালি আঁশের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা। বাতাসের সঙ্গে দোল খাচ্ছে ক্ষেতে থাকা লিকলিকে বাড়তে থাকা পাট গাছগুলো। তাইতো সোনালি আঁশের স্বপ্ন পূরণের দারপ্রান্তে চাষিরা। পাটের জন্য বিখ্যাত ফরিদপুর জেলা। গুনে ও মানে দেশ সেরা এ জেলার পাট। তাই এ জেলার ব্রান্ডিং হিসেবে পাট সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে।
ফরিদপুর জেলা সদর, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, মধুখালী ও সালথা উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ মৌসুমে সঠিক সময়ে পরিমাণমতো বৃষ্টি এবং অনুকূল আবহাওয়ায় পাটের ফলনও অন্য বছরগুলো থেকে অনেক ভালো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়নের বাইখির, ধুলপুকুরিয়া, বনচাকী গ্রামে পাট ক্ষেতে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে চাষিরা। এ ছাড়া নগরকান্দা, সালথা, মধুখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলোর ক্ষেতে একই রকম চিত্র। বিস্তৃর্ণ এলাকায়ও চোখে পড়ে সবুজের দ্যুতি ছড়ানো এ দৃশ্য। অনুকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়ে বাড়তে থাকা সবুজ পাট গাছগুলো সোনালি স্বপ্ন দেখাচ্ছে ফরিদপুর অঞ্চলের কৃষকদের। আর স্বপ্নবিভোর কৃষক আশা করছেন বাম্পার ফলন ও ন্যায্য দামের।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে এ জেলায় ৮৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সেখানে চাষিরা ৮৫ হাজারের হেক্টরেরও বেশি পরিমাণ জমিতে আবাদ করেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবাদ ভালো হয়েছে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী জানান, বর্তমান সরকার খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্যে পরিবেশ বান্ধব পাটের মোড়ক ব্যবহার করায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাটের উৎপাদন ও বাজার দর। ফলে গত কয়েক বছর ধরে প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদেরও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে। সোনালি আঁশ ঘিরে সোনালি স্বপ্ন দেখছে খেটে খাওয়া মানুষগুলো।
তিনি বলেন, এ বছর পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। সময়মত বৃষ্টি হওয়ায় পাট গাছগুলো ভালো হয়েছে। এ জেলার চাষিরা মূলত দুই জাতের পাট তোষা ও মেস্তা জাত আবাদ করে থাকে। এর মধ্যে তোষা জাতটি চাষিদের কাছে অধিক প্রিয়।
বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোহায়মেন ইসলাম বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় পাট কম পরিশ্রমে অধিক লাভজনক একটি ফসল। কম খরচে ভালো ফলন হওয়ায় বর্তমানে কৃষকরা আবারও পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছর ধরে পাট চাষের পরিমাণও বেড়েছে।
নগরকান্দা উপজেলার শশা গ্রামের চাষি রফিক মোল্লা বলেন, একটা সময় পাটই ছিল আমাদের ভরসার ফসল। বাপ-চাচারা কত কষ্ট করে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পাট চাষ করতেন। পানিতে ডুবে জাগ দিতেন, ভালোভাবে পঁচলে তারপর মাচা পেতে আঁশ ছড়াতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই যেনো সব কিছু নাই হয়ে গেল।
কানাইপুর ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামের কৃষক আবদুল জলিল বলেন, গত বছর ফলন ভালো হওয়ায় এবং চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা এবারও পাট চাষের দিকে ঝুঁকছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, সোনালি আঁশের কাঙ্খিত দাম নিয়ে তাদের মাঝে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও কাটার পর পচানোর জায়গা নিয়ে তেমন চিন্তা নেই। বৈশাখের শুরু থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের ধারা বর্ষা পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় এবারে পাট পঁচাতে পানি নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হবে না। এখন অপেক্ষা কেবল পাট গাছ থেকে সোনালি আঁশ ছাড়িয়ে তা বাজারে বিক্রি করা। সেখানে ন্যায্য দাম মিললেই কৃষকদের মুখে লেগে থাকা হাসিটা আরও রঙিন হবে।
দেশিয় ও বিশ্ব বাজারে দিন দিন পাটের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, গুনে ও মানে ফরিদপুরের পাট দেশে সেরা। এ জেলার পাটের আঁশে বিশেষ ধরনের বৈশিষ্ট রয়েছে যা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ফরিদপুর পাটের জন্য খ্যাত। এ কারণে জেলার ব্রান্ডিং পন্য হিসেবে পাটকেই বেছে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলার স্লোগান পাটকে নিয়েই ‘সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালবাসী ফরিদপুর’।
আরএ/এমএস