জনগণের সবচেয়ে কাছের বাহিনী হচ্ছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০২১

সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে গত বছরের ১৯ মে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ পিপিএম-সেবা। সিলেটে যোগদানের আগে মফিজ উদ্দিন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ডিএমপির উপকমিশনার (ডিসি-লালবাগ), পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলায়। এছাড়া মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লাইবেরিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন।

বাংলা সাহিত্যেও তার বিচরণ রয়েছে। এ পর্যন্ত তার দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর একটি কাব্যগ্রন্থ ‘খেয়াল’। অপরটি ছোট গল্পের বই ‘ফিরে দেখা’। তার এ দুটি বই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। মাগুরার শ্রীপুরে জন্ম নেয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত জীবনে দুই মেয়ে ও এক ছেলেসন্তানের জনক। তার স্ত্রীও একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকায় কর্মরত।

নতুন বছরের প্রাক্কালে সিলেট রেঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভাগের চার জেলা ও ৩৯ থানা নিয়ে তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা কী তা জানতে সিলেট রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে একান্তে কথা বলেন দেশের শীর্ষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমের নিজস্ব প্রতিবেদক ছামির মাহমুদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর করা মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ সিলেট রেঞ্জের পুলিশ নিয়ে তার বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার কথা খোলামেলা আলোচনা করেন।

জাগো নিউজ : নতুন বছরে সিলেট রেঞ্জের পুলিশ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : খুব বেশি পরিকল্পনা নেই। বিভিন্ন ইউনিটে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং পুলিশের রুটিন কাজগুলোকে ঠিকমতো পরিচালনা করা। রেঞ্জের মোট ৩৯টি থানা ও চার জেলার রিজার্ভ পুলিশকে জনবান্ধব করে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখা। পুলিশকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়ে সেবা নিশ্চিত করা।

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এই আপ্তবাক্যকে শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা। এটাই আপাতত নতুন বছরে আমার পরিকল্পনা। আমার চাওয়া হচ্ছে, পুলিশ সাধারণ জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের যম হবে। অপরাধী যেই হোক পুলিশ তাকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করবে।

জাগো নিউজ : রেঞ্জের বেশকিছু পৌর শহরেও ইদানীং যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আপনার কোনো উদ্যোগ আছে কি?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : দেখুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে আমি ডিসি (ট্রাফিক), যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ও সর্বশেষ ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। রাজধানীর সড়কের শৃঙ্খলায় দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সিলেটের ১৯টি পৌরশহর যানজটমুক্ত রাখতে; সড়ক ব্যবস্থাপনা, শহর ব্যবস্থাপনা, সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০১৮ কার্যকর করে বাস-ট্রাক-সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও পথচারীদের শৃঙ্খলা আনয়নে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শহরগুলোকে যানজটমুক্ত রেখে মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচানো যাবে। একইসঙ্গে এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনাও কমবে।

DIG-Sylhet-(4).jpg

জাগো নিউজ : সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণী গণধর্ষণের পর অভিযুক্তরা পালিয়ে গেলেন। প্রথম ৩৮ ঘণ্টায়ও কেউ ধরা না পড়ায় মানুষের ভাবনা ছিল, সবাই মনে হয় পার পেয়ে যাবেন। পরে ঘটলো উল্টো। একে একে এজাহারভুক্ত ছয় আসামির মধ্যে চারজনকেই রেঞ্জ পুলিশ গ্রেফতার করে। শুরুতে আপনার একটি কৌশল নাকি খুব কার্যকর হয়েছে। কী সেটা, বলা যাবে?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : না, কৌশলটা গোপন কিছু না। বলতে পারেন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। এমসি কলেজ ছাত্রাবাস সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অধীন। ঘটনাস্থল যেহেতু এসএমপির, তাই শুরুতে আমাদের কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু সেখান থেকে সব অপরাধী পালিয়ে যান। পালিয়ে যাবেন তো রেঞ্জ পুলিশ এলাকা হয়েই। তাই সতর্ক করা হয় রেঞ্জ পুলিশকে। দেখলাম, তিনজন আসামির বাড়ি সীমান্ত এলাকায়। শুরুতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ালাম। এরপর তাদের গ্রামের বাড়ির দিকে তিন স্তরের নজরদারি রাখা হয়। জনপ্রতিনিধিদেরও অংশগ্রহণ ছিল। সীমান্ত নজরদারিটাই কাজে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে দোয়ারাবাজার যাওয়ার সময় গ্রেফতার হন প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। এরপর চুনারুঘাট সীমান্ত এলাকা হয়ে যাওয়ার পথে আরও একজন গ্রেফতার হন। নবীগঞ্জ এলাকায় রাতে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া জৈন্তাপুর থেকেও একজনকে গ্রেফতার করা হয়। আসামি গ্রেফতার আমরা শুরু করেছি, শেষটা করলো র‌্যাব। আমাদের অভিযান জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চৌকস কর্মকর্তাদের একটি দল নিয়ে, যারা প্রযুক্তিতে খুবই দক্ষ।

জাগো নিউজ : মহানগর থেকে পালিয়ে জেলা পুলিশ তথা সিলেট রেঞ্জ পুলিশের আওতাধীন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ধরা পড়লেন আসামিরা। সমন্বিত অভিযানের চিন্তাটা কেমন করে এলো?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : ওই যে বললাম, এসএমপি এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে আমাদের ঘাড়ে এসে পড়লেন অপরাধীরা। আমাদের হাতে চারজন আর র‌্যাবের হাতে দুজন ধরা পড়লেন।

জাগো নিউজ : অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে অপকর্ম করেছেন। পালিয়েছেনও সংঘবদ্ধভাবে। ধরা পড়ার সময় দেখা গেল একেকজন একেক জায়গায়। কেউ পরিবারের কাছে বা এলাকায় যাননি। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : অপরাধের ধরনের কারণে এমনটি হয়েছে। পরিবার আশ্রয় দেবে না ভেবে সেখানে যায়নি। এলাকার মানুষজনও ক্ষুব্ধ ছিল। দেখামাত্র ধরিয়ে দেয়ার প্রস্তুতিও দেখা গেছে। আমি মনে করি, এ ধরনের অপরাধ করলে অবস্থা কী হয়, এমন একটি সামাজিক বার্তা এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পাওয়া গেছে।

DIG-Sylhet-(4).jpg

জাগো নিউজ : একটি ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রথম পদক্ষেপ আসামি গ্রেফতার। সেটি সফলভাবে শেষ হলো। মানুষ খুশি। আপনি কী ভাবছেন?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : জনগণের সবচেয়ে কাছের বাহিনী হচ্ছে পুলিশ। মানুষের খুশিতে আমিও খুশি। পুলিশ প্রমাণ করল, অপরাধীরা যে পরিচয়েই অপরাধ করুক না কেন, ছাড় নেই। আমাদের প্রথম কাজটি শেষ, এখন বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে কাজটি এগিয়ে নেবে নগর পুলিশ। দ্রুততার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হবে, এটিই আশা করি।

জাগো নিউজ : সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমেদ হত্যার পর প্রধান অভিযুক্ত মহানগর পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে গেলেও দেখা যায় সেই প্রধান অভিযুক্ত ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকেও গ্রেফতার করে জেলা পুলিশ। এখানেও সফল সিলেট রেঞ্জ পুলিশ। সাধারণ মানুষের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন, এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : এসএমপির লাইন থেকে এসআই আকবর পালিয়ে যাওয়ার পর আমি রেঞ্জ পুলিশকে সতর্ক করে তাকে গ্রেফতারে জেলা পুলিশকে নির্দেশনা দেই। পরে সীমান্ত দিয়ে পালানোর সময় স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হয়। পুলিশ প্রমাণ করে দিয়েছে অপরাধীরা যেই হোক না কেন অপরাধ করলে কোনো ছাড় নেই।

জাগো নিউজ : সিলেটকে প্রকৃতিকন্যা আখ্যা দিয়ে সরকার এ অঞ্চলে পর্যটক বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটক বাড়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে নিরাপত্তা। কিন্তু ইদানীং পর্যটন এলাকায় কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। এসব বন্ধে আপনার কোনো উদ্যোগ আছে কি?

মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ : দেখুন, পর্যটন এলাকাগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষায়িত পর্যটন পুলিশ রয়েছে। তারা পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করেন। এর বাইরেও রেঞ্জ পুলিশ পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ভ্রমণকে নিরাপদ করতে কাজ করছে। আমরা পর্যটন পুলিশের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে পর্যটকদের ভ্রমণকে আনন্দময় করতে কাজ করছি। কেউ অপরাধ করলে তাকে পুলিশ চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।

ছামির মাহমুদ/এআরএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]