আমজাদ ‘রাজাকার’ জামিনে মুক্ত, নিরাপত্তাহীনতায় বাদী ও সাক্ষীরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৫:২৫ পিএম, ২১ মার্চ ২০২১
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা ও সাক্ষ্য দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এই চারজন

আমজাদ মোল্লা। যশোরের প্রেমচারার ‘রাজাকার’ হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি জামিন মুক্তি পেয়েছেন। এরপর থেকেই যশোরের বাঘারপাড়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তার লোকজন। তারা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের হুমকি দিচ্ছেন। এতে করে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে শহীদ পরিবারের বাদী ও সাক্ষীদের।

অভিযোগ করা হয়, শহীদ রজব আলী বিশ্বাসের ছেলে ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী কৃষক খোকন বিশ্বাস ও আবুল বিশ্বাসের নামে ১০ লাখ টাকার চাঁদাবাজি মামলা করেন আমজাদের সহযোগী মহসীন আলী বিশ্বাস।

এছাড়া মামলার সাক্ষী আলাউদ্দিন বিশ্বাস, বিএম রুহুল আমিন ও রকিব উদ্দিন রতন বিশ্বাসকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছেন অভিযুক্তরা।

শুধু তাই নয়, যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেয়ায় প্রাণ দিতে হয়েছে আরেক সাক্ষী এহিয়ার রহমানের ভাই তফসির মোল্লাকে। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে এহিয়ার বললেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু প্রেমচারা এখনো রাজাকারমুক্ত হয়নি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঘারপাড়া উপজেলার প্রেমচারা গ্রামের আমজাদ মোল্লা নিজ বাড়িতে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। ওই ক্যাম্পের সদস্যরা বহু মানুষকে নির্যাতন, হত্যাসহ নানা অত্যাচার করতেন। আমজাদ হোসেনকে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়।

একাত্তরে আমজাদ বাহিনীর হাতে নিহত আয়েন উদ্দীন আয়না ও ময়েন উদ্দীন ময়না হত্যা মামলার বাদী আলাউদ্দিন বিশ্বাস (৮২) একাত্তরের নৃশংসতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তিনি জানান, আয়না ও ময়না হত্যার বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করার পর থেকে আমজাদ বাহিনী বাড়িতে হামলা করছে, হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে আমজাদ জামিন পেয়েছেন। এরপর তার সহযোগী মহসীন বিশ্বাস দেশে ফিরে আসেন।

গ্রামে ফিরে মামলার বাদীকে মহসীন বলেন, ‘আমজাদকে তো আটকে রাখতে পারিনি, এখন দেখি তোদের কে বাঁচায়?’

jagonews24

চাঁদাবাজির মামলার শিকার হয়েছেন এই দুজন।

মহসীন ও তার লোক টুটুল মণ্ডল, শওকত মণ্ডল ও আলম মোল্লা বাদী-সাক্ষীদের হত্যার হুমকি দিচ্ছেন, ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন আলাউদ্দিন বিশ্বাস। একই অভিযোগ অপর সাক্ষী বিএম রুহুল আমিন ও রকিব উদ্দিন রতন বিশ্বাসের।

এদিকে রজব আলী বিশ্বাসকে হত্যার অভিযোগে আমজাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বাঘারপাড়ার পার্শ্ববর্তী গ্রাম মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার আড়য়াকান্দির খলিলুর রহমান খোকন বিশ্বাস। খোকন রজব আলীর ছেলে।

মামলার সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্য হুমকি ও নির্যাতনের পর এখন হতদরিদ্র কৃষক খোকনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি খোকন ও তার ভাই আবুল বিশ্বাসসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি মামলা করেন মহসীন।

ভয়ে তটস্থ খোকন ও আবুল বললেন, ‘আমরা পেট ভরে দু’বেলা খেতে তো পারি না। এখন স্বাধীন দেশে রাজাকারের হাত থেকেও কী একটু নিরাপদে থাকতে পারব না? আমাদের জন্য কিছু একটা করেন নইলে আমাদের মেরে রেখে যান।’

আমজাদের সহযোগী মহসীনের নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে আরেক সাক্ষী বাঘারপাড়ার প্রেমচারা গ্রামের এহিয়ার রহমান বলেন, ‘রাজাকার আমজাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ায় তার লোকজন আমার চাচাতো ভাই তফসির মোল্লাকে গলাকেটে হত্যা করেছে। ভাই-ভাইপোকে কুপিয়ে জখম করেছে। উল্টো আমাদের ষড়যন্ত্রমূলক ১৬টি মামলায় জড়িয়েছে। আমার দোকান ভাঙচুর করেছে, বাড়িতে আগুন দিয়েছে। এখন পুলিশি পাহারায় জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। আমজাদ রাজাকার জামিন পাওয়ায় মহসীনরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই মহসীন এতটা বেপরোয়া যে, আমজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক খানের গাড়িবহরেও হামলা করেছিলেন। এ ঘটনায় আব্দুর রাজ্জাক খান বাদী হয়ে বাঘারপাড়া থানায় মামলাও দায়ের করেন।

মামলার বাদী ও সাক্ষীরা অভিযোগ করেন, আমজাদ গ্রেফতার হওয়ার পর হুমকি কিছুটা কমলেও বর্তমানে জামিনে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার বাহিনী আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মহসীন বিশ্বাসের নেতৃত্বে তারা নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ফলে নিরাপত্তা চেয়ে বাঘারপাড়া ও শালিখা থানায় জিডি করেন খোকন বিশ্বাস, আলাউদ্দিন বিশ্বাস ও বিএম রুহুল আমিন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন আমজাদের সহযোগী মহসীন বিশ্বাস। তিনি দাবি করেন, খোকন বিশ্বাস, আলাউদ্দিনরা তাকে হুমকি দিচ্ছেন, ভয় দেখাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও দিয়েছেন। তিনি কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি গ্রাম্য রাজনীতির শিকার। খোকন বিশ্বাস তার কাছে চাঁদা চাওয়ায় তিনি মামলা করেছেন বলেও দাবি করেন।

এ প্রসঙ্গে যশোরের বাঘারপাড়া থানার ওসি ফিরোজ উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার সাক্ষীরা কয়েকটি জিডি করেছেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে জিডিগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

মিলন রহমান/জেডএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]