অবশেষে স্বামীর পেনশন পাচ্ছেন সেই ফজিলা
‘নিখোঁজ স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট খুঁজে ফেরা’ সেই ফজিলা বেগম অবশেষে স্বামীর পেনশনের অর্থ পাচ্ছেন। সম্প্রতি রাজশাহী সেনানিবাস থেকে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
২০০৭ সালে তার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আব্দুল হানিফ নিখোঁজ হন। এ ঘটনার ১৪ বছর পর পেনশন প্রদান শুরু হলো। এর আগে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফজিলা বেগমকে নিয়ে জাগো নিউজে ‘চার সন্তান নিয়ে সেনা সদস্যের স্ত্রী’র করুণ দশা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে উঠে আসে।
যশোর শহরের রায়পাড়া এলাকার ভাড়াবাড়িতে বসে ফজিলা বেগম জানান, তার স্বামী আব্দুল হানিফ মোল্লা সেনাবাহিনীর ল্যান্সনায়েক পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর ঢাকায় ট্যাক্সিক্যাব চালাতেন। আর চার ছেলে মেয়ে নিয়ে যশোরে বসবাস করতেন ফজিলা।
২০০৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে বের হন আব্দুল হানিফ। এরপর আর তার কোনো সন্ধান মেলেনি। দুই দিন পর ট্যাক্সিক্যাবটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ঢাকার রাজমনি সিনেমা হলের পেছনে পাওয়া যায়। হানিফ মোল্লা নিখোঁজের ঘটনায় লিঙ্কস ক্যাবের (বিডি) কর্মকর্তা ওবায়দুল হক ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কাফরুল থানায় একটি জিডি করেন।
ফজিলা বেগম বলেন, হানিফ মোল্লা নিখোঁজের খবরে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে তার। এরপর ঢাকায় ছুটে যান তিনি। থানা-পুলিশ বহু জায়গায় ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু স্বামীর সন্ধান পাননি ফজিলা। একদিকে স্বামী নেই, অন্যদিকে ছোট চার সন্তান। উপায় না পেয়ে ছুটেছেন স্বামীর সর্বশেষ কর্মস্থলে। গেছেন খুলনার সোনালী ব্যাংক স্যার ইকবাল সড়ক শাখায়, যেখানে স্বামীর অবসর ভাতা গ্রহণের অ্যাকাউন্ট। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। না পেয়েছেন স্বামীর সন্ধান, না পেরেছেন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে। যেখানেই গেছেন সেখানেই ‘স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট’ চেয়েছে। কিন্তু নিখোঁজ স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট কোথায় পাবেন তিনি!
একযুগ ধরে এই ডেথ সার্টিফিকেটের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ানো ফজিলাকে নিয়ে ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল অসহায় ফজিলার পাশে এসে দাঁড়ান। তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতাসহ যশোর সদর সহকারী জজ আদালতে মামলার ব্যবস্থা করে দেন। ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ আব্দুল হানিফ মোল্লার ডেথ সার্টিফিকেট চেয়ে আদালতে মামলা হয়। এক যুগ ধরে হানিফ মোল্লার আর কোনো সন্ধান না পাওয়ার তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে ওই বছরের ২১ জুলাই সদর সহকারী জজ আদালতের বিচারক তরুণ বাছাড় আব্দুল হানিফ মোল্লা মৃত বলে ডিক্রি জারি করেন। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত হানিফ মোল্লাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ডিক্রির বুনিয়াদে বাদী ফজিলাকে ডেথ সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।
এরপর আরেক লড়াইয়ে নামেন ফজিলা। এই ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে তিনি রাজশাহী সেনানিবাসে আবেদন করেন পেনশনের জন্য। দীর্ঘ দেড় বছর নানা প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে সম্প্রতি চূড়ান্ত কাগজপত্র হাতে পেয়েছেন তিনি।
ফজিলা বেগম জানান, সংবাদ প্রকাশের পর সেই সময়ের ডিসি তাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তিনিই ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরে ক্যান্টনমেন্টের কর্মকর্তারাও অনেক সহযোগিতা করে পেনশন পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য তিনি সেনাপ্রধান, তৎকালীন জেলা প্রশাসকসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তিনি আরও জানান, কোনোরকমে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ফজিলা বেগম। এখন এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ভাড়াবাড়িতে বাস করেন। ভূমিহীন হিসেবে সাবেক সেনাসদস্যের এই পরিবারকে একটু মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দেয়ার জন্য তিনি সেনাপ্রধানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
মিলন রহমান/এমএসএইচ/এএসএম