তৈরি পোশাকে ‘বিশ্বজয়ী বাংলাদেশ’ তুলায় বিদেশনির্ভর

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:২৯ পিএম, ২৮ মার্চ ২০২৬
বর্তমানে মোট চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশই আমদানি করে মেটাতে হয়/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা হলেও এর জোগানে প্রায় পুরোটাই বিদেশনির্ভর। প্রয়োজনীয় তুলা আমদানিতে বাংলাদেশ শীর্ষ কাতারে। চীনকে টপকে কয়েক বছর শীর্ষেও ছিল। বর্তমানে মোট চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশই আমদানি করে মেটাতে হয়।

সারাদেশে এখন কমবেশি ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে। উৎপাদন হচ্ছে দুই লাখ বেল (প্রতি বেলে ১৮২ কেজি)। গত বছর ৪৫ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে তুলা উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ১০ হাজার বেল।

রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দেশে তুলার চাহিদাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। তবে এত চাহিদা বাড়ার পরও দেশে তুলা উৎপাদিত হয় মোট চাহিদার মাত্র ৩–৪ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত চাহিদার পরও তুলা উৎপাদনে প্রত্যাশিত কাজ করতে পারছে না সরকার। সে ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা তুলা উন্নয়ন বোর্ডেরও উৎপাদন বাড়াতে ও নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে কার্যকর গবেষণা নেই। বোর্ডের ব্যর্থতার সঙ্গে সরকারের সহযোগিতার অভাব ও বরাদ্দে অবহেলার কারণে চাহিদার ন্যূনতম তুলাও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অথচ উৎপাদন বাড়িয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব ছিল।

তুলা উৎপাদন

তুলা উন্নয়ন বোর্ড মনে করে, জমিস্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কখনো সম্ভব হয়নি। এমনকি চাহিদার অর্ধেক উৎপাদন করাও অসম্ভব। বর্তমান বাস্তবতায় জোর চেষ্টা চালালে চাহিদার সর্বোচ্চ ১০–১৫ শতাংশ তুলা উৎপাদন করা যেতে পারে।

বছরে তুলা আমদানিতে যায় ৪-৫ বিলিয়ন ডলার

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে থাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল তুলা। গত বছর (২০২৫) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইকোনমিকস (বিএই) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যাতে দেখা যায়, তুলা আমদানিতে বছরে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে বাংলাদেশ।

জমি স্বল্পতার কারণে প্রচেষ্টা থাকলেও অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরেও জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে তুলার সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে সবজি, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বরেন্দ্র, লবণাক্ত, চরাভূমি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও পার্বত্য এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ হচ্ছে।-তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল আমিন

ওই গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছরই তুলা আমদানি ও ব্যয়ের অংক উল্লেখযোগ্য, যদিও বছরভেদে কিছুটা ওঠানামা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ৮৩ লাখ বেল তুলা আমদানি করেছে, যাতে ব্যয় হয়েছে ৩৯২ কোটি ডলার। ২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরের ওই গবেষণা বলছে, ২০২০ সালে ৬৫ লাখ বেল তুলা আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছিল ৩২৯ কোটি ডলার। পরের বছর ২০২১ এ ব্যয় হয় ৪৭২ কোটি ডলার, ২০২২ এ ৫০৪ কোটি ডলার ও ২০২৩ সালে ৪০২ কোটি ডলার।

উৎপাদন, চাহিদা ও আমদানি পরিস্থিতি

এ বছর (২০২৫-২৬ অর্থবছর) সারাদেশে ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৫২ হাজার বেল। গত বছর ৪৬ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে তুলা উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ১৯ হাজার বেল।

তুলা চাষ

গত কয়েক বছর ধরেই ২ লাখ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার বেলের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে উৎপাদন। বাংলাদেশের বর্তমানে ৩৯টি জেলার ১৩২টি উপজেলায় তুলা চাষ হচ্ছে। চাষের জমির পরিমাণও বাড়ছে ধীরগতিতে। দেশে চার জাতের তুলা- চরাঞ্চলের জন্য চর কটন, পাহাড়ের জন্য হিল কটন, সমতলের জন্য আপলাইন কটন ও বরেন্দ্র এলাকার জন্য ড্রাউট কটন চাষ হচ্ছে।

দেশে প্রতি বছর তুলার চাহিদা রয়েছে প্রায় ৮৫ লাখ বেল। এর মধ্যে শুধু দেশের ৫১৯টি টেক্সটাইল মিলে বাৎসরিক তুলার চাহিদা প্রায় ৮০ লাখ বেল। প্রতি বছর আমদানি করতে হয় প্রায় ৮৩ লাখ বেল।

বাংলাদেশ বর্তমানে সর্বাধিক তুলা আমদানি করছে ব্রাজিল থেকে। এর আগে ভারত শীর্ষে ছিল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকার দেশ বেনিনসহ কয়েকটি দেশ থেকে মূলত তুলা আমদানি করে।

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল এলাকার তুলা চাষি মনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার যেভাবে খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী, সেভাবে তুলা উৎপাদনে মনোযোগ দেয় না। বীজ পেতে মাঝে মধ্যে সমস্যা হয়, দামও বেশি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া উঁচু জমিতে তুলার যতটুকু ফলন, সেই জমিতে অন্য শস্য চাষ সহজ ও লাভজনক। যে কারণে অনেকে এখন তুলা চাষ ছেড়ে দিচ্ছে।’

কী করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড

বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী বস্ত্র শিল্পের বিকাশের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে টেক্সটাইল মিলে ব্যবহার উপযোগী আঁশ তুলার জোগান বাড়াতে ১৯৭২ সালে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। ১৯৯১ সালে তুলা গবেষণার দায়িত্ব বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দেওয়া হয়। এরপর থেকে দেশে তুলার উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নতুন জাত-প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ সম্প্রসারণের পুরো দায়িত্ব এ সংস্থার ওপর।

এ দীর্ঘসময়েও তুলা উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের ধারে-কাছে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর সংস্থাটি গবেষণা, তুলা চাষ সম্প্রসারণ, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও জিনিং কাজে সহায়তার জন্য সরকারের প্রচুর বরাদ্দ পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। তবে প্রত্যাশিত উৎপাদন এখনো অধরা।

টার্গেট কী এ বোর্ডের?

দেশের চাহিদার ২০ শতাংশ তুলা উৎপাদন করতে চায় এ বোর্ড। তবে সীমাবদ্ধতা রয়েছে অনেক। জমিস্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কার্যত সম্ভব নয়। এমনকি চাহিদার অর্ধেক উৎপাদন করাও অনেকটা অসম্ভব। বর্তমান বাস্তবতায় জোর চেষ্টা চালালে চাহিদার সর্বোচ্চ ১০–১৫ শতাংশ তুলা উৎপাদন করা যেতে পারে। তবে বোর্ডের ব্যর্থতার পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতার অভাব, গবেষণায় অবহেলার কারণে এই পরিমাণ তুলাও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

তুলা চাষ

এ বিষয়ে বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। তুলা ও তুলা ফসলের উপজাত, লাগসই ও উচ্চ ফলনশীল জাতের মাধ্যমে এর উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ু উপযোগী ও কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মানসম্পন্ন উচ্চফলনশীল জাতের বীজ সরবরাহ, বিদ্যমান চাষ এলাকার পাশাপাশি দেশের স্বল্প উৎপাদনশীল জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তার মাধ্যমে তুলার উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জমি স্বল্পতার কারণে প্রচেষ্টা থাকলেও অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরেও জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে তুলার সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে সবজি, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বরেন্দ্র, লবণাক্ত, চরাভূমি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও পার্বত্য এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, তুলা উন্নয়ন বোর্ড গবেষণার মাধ্যমে সিবি-১২, সিবি-১৩, সিবি-১৪, সিবি-১৫, সিবি-১৬, সিবি-১৭, সিবি-১৮, সিডিবি তুলা-১৯, সিডিবি তুলা-২০, সিডিবি তুলা-২১ ও পাহাড়ি তুলা-৩ নামে ২৪টি উচ্চফলনশীল জাত অবমুক্ত করা হয়েছে এ পর্যন্ত। এছাড়াও সিবি হাইব্রিড-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড অবমুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে হাইব্রিড জাতের তুলার বীজ ২০০৯-১০ মৌসুম হতে মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। বিঘাপ্রতি গড় ফলন বেড়ে এখন ১২-১৫ মণ।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড এ পর্যন্ত গবেষণার মাধ্যমে একটি হাইব্রিড, ২৬টি উচ্চফলনশীল জাত ও ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১ হাজার ১০০ জন তুলা চাষির মধ্যে ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কৃষি প্রণোদনা সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় হাইব্রিড তুলা বীজ, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বিনামূল্যে বিতরণ করেছে।

এনএইচ/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।