ছিলেন একাই একশ, বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের নায়ক মান্নাকে হারানোর ১৮ বছর
একটা সময় ছিল, যখন পাইরেসি, দর্শক খরা, অশ্লীলতাসহ নানা জটিলতায় ঢালিউড কঠিন সংকটে। হল ফাঁকা, প্রযোজক দিশেহারা, দর্শক বিমুখ। সেই সময়টায় যিনি একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি মান্না। শুধু নায়ক নন; তিনি ছিলেন ভরসা, তিনি ছিলেন ইন্ডাস্ট্রির শেষ আশ্রয়। তাই তাকে বলা হতো ‘একাই একশ’।
টাঙ্গাইলের এস এম আসলাম তালুকদার সিনেমায় এসে হয়ে উঠলেন গণমানুষের নায়ক মান্না। এই নামটি উচ্চারণ করলেই নব্বই দশকের হলভর্তি দর্শক, শিস-তালি আর প্রতিবাদের সংলাপ কানে ভেসে আসে। আজ এই জনপ্রিয় নায়কের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী।
২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান মান্না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংগঠক হিসেবেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্রের দুর্দিনে অনেক জ্যেষ্ঠ শিল্পীকে আবার পর্দায় ফিরিয়ে আনেন তিনি।
স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে নায়ক মান্না
১৯৮৪ সালে নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন মান্না। প্রথম অভিনীত সিনেমা ‘তওবা’, তবে আগে মুক্তি পায় ‘পাগলী’। দীর্ঘ সময় দ্বিতীয় নায়ক হিসেবে কাজ করলেও ১৯৯১ সালে ‘কাসেম মালার প্রেম’ সিনেমায় প্রথম একক নায়ক হিসেবে সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু তার নতুন অধ্যায়।
‘দাঙ্গা’, ‘ত্রাস’, ‘অন্ধ প্রেম’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘বাবার আদেশ’- একটির পর একটি হিট সিনেমা তাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। নব্বই দশকের শেষভাগে ‘আম্মাজান’, ‘লাল বাদশা’, ‘খবর আছে’, ‘কে আমার বাবা’সহ একাধিক সুপারহিট সিনেমা উপহার দেন তিনি।
তারেক রহমানের সঙ্গে নায়ক মান্না
তার সিনেমা মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী চরিত্র। বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হলভর্তি দর্শক আর প্রযোজকের হাসি দুই-ই ছিল তার সাফল্যের মাপকাঠি। তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য রেকর্ড।
শুধু অভিনেতা নন, প্রযোজক হিসেবেও ছিলেন সফল। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত ‘লুটতরাজ’, ‘লাল বাদশা’, ‘আব্বাজান’, ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘দুই বধূ এক স্বামী’, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’, ‘মান্না ভাই’ ও ‘পিতা মাতার আমানত’ প্রতিটি সিনেমাই ব্যবসাসফল হয়।
মান্না শুধু পর্দার নায়ক ছিলেন না, ছিলেন বাস্তবের লড়াকু মানুষ। ইন্ডাস্ট্রির খারাপ সময়ে নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিয়ে সিনেমাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তার বজ্রকণ্ঠ সংলাপ, দৃঢ় উপস্থিতি আর সাধারণ মানুষের গল্প বলার সাহস তাকে আলাদা করে দিয়েছে।
ভক্তরা ভালোবেসে মান্নাকে মহানায়ক বলে ডাকেন
১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মান্না এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন সত্যিকারের নায়ক শুধু পর্দায় নয়, সময়ের সংকটেও জন্ম নেয়।
এলআইএ