ইউক্রেনের অধিকৃত এলাকায় গণভোট দিয়ে কী করতে চান পুতিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৪ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের চারটি অধিকৃত অঞ্চল রুশ ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রশ্নে গণভোট শুরু হয়েছে শুক্রবার (২৩ সেপ্টম্বর)। লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝিয়া ও খেরসনে আয়োজন করা এই গণভোটকে অবৈধ বলছে ইউক্রেন ও তার মিত্র পশ্চিমারা। ইউক্রেনের এসব অঞ্চলকে রাশিয়ার সীমানাভুক্ত করার লক্ষ্যেই এই গণভোটের ‘নাটক’ সাজানো হয়েছে বলে দাবি কিয়েভের।

গণভোট হবে পাঁচ দিন ধরে। যদিও ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণের এই চারটি অঞ্চলেই তীব্র যুদ্ধ চলছে।

কী ঘটছে এবং এখন কেন এই গণভোট
সাত মাস আগে পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেন আক্রমণ করে রুশ বাহিনী। কিন্তু পুতিন-বাহিনী এখন পাল্টা আক্রমণের মুখে রয়েছে। এতে কিছুটা সাফল্যও পেয়েছে ইউক্রেনীয়রা। রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর পর যেসব অঞ্চল দখল করেছিল, তার কিছু অংশ ইউক্রেন পুনর্দখল করতে পেরেছে।

এ অবস্থায় ক্রেমলিন যুদ্ধকে নতুন আঙ্গিকে পরিচালনার জন্য যে তিনটি পরিকল্পনা নিয়েছে, তার একটি হলো অধিকৃত অঞ্চলে গণভোট। স্বাধীন ইউক্রেনের এই ১৫ শতাংশ এলাকা রাশিয়া যদি নিজের সীমানাভুক্ত করতে পারে, তখন মস্কো দাবি করতে পারবে, ইউক্রেনকে দেওয়া ন্যাটো জোট ও পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র দিয়ে তাদের ভূখণ্ডে আক্রমণ চালানো হচ্ছে।

গত সপ্তাহে রাশিয়া আরও তিন লাখ বাড়তি সৈন্যকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তলব করেছে। দেশটি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রণক্ষেত্র প্রতিরক্ষায় এদের মোতায়েন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত সৈন্য সংগ্রহের এই সময়কালে রুশ সামরিক বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, আত্মসমর্পণ বা বিনা ছুটিতে কাজে অনুপস্থিত থাকা ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে।

jagonews24

এর আগে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময়ও সেখানে এ ধরনের গণভোটের আয়োজন করেছিল রাশিয়া। তখন সেই ভোটকেও ‘সাজানো খেলা’ উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করেছিল পশ্চিমারা।

ইউক্রেনের চারটি অধিকৃত অঞ্চলে এবারের গণভোটকে একইভাবে অবৈধ বলে নিন্দা করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। ইউক্রেন বলছে, পুতিনের সমর্থনে আয়োজন করা এই গণভোটের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে রুশ গণমাধ্যমগুলো বলছে, গণভোটে যে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

গণভোটকে কেন পাতানো বলা হচ্ছে
২০১৪ সালে ক্রিমিয়ায় অনুষ্ঠিত গণভোটে রাশিয়ায় যোগদানের পক্ষে ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে দাবি করেছিল ক্রেমলিন। তবে রাশিয়ার হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের এক ফাঁস হওয়া প্রতিবেদন বলছে, আসলে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিল এবং কোনরকমে এর অর্ধেক ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

তবে গণভোটের সময় ক্রিমিয়ায় একটি গুলিও চলেনি। কিন্তু এবারের গণভোট হচ্ছে যুদ্ধের মধ্যে। যে চারটি অঞ্চলে ভোট হচ্ছে সেগুলো হয় পুরোপুরি অথবা অংশ বিশেষ রাশিয়ার দখলে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসনে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে ইউক্রেনীয়রা। গত সপ্তাহেই খেরসনের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ভবনে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে নিরাপদে গণভোট করা রীতিমতো অসম্ভব। কিন্তু তারপরও রুশপন্থি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ ভোটদানের জন্য নিবন্ধন করেছেন।

ইউক্রেনের আরেকটি অঞ্চল মিকোলাইভকেও খেরসনের সীমানাভুক্ত করার পরিকল্পনা হচ্ছে, যাতে পুরোটাই রাশিয়ার অংশ করা যায়।

রুশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, নির্বাচনী কর্মকর্তারা গণভোটের সময় ব্যালট বাক্স নিয়ে শুক্রবার হতে সোমবার পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাবেন। ভোটকেন্দ্র খোলা হবে কেবল পঞ্চম দিনে (২৭ সেপ্টেম্বর)। নির্বাচনী কর্মকর্তারা এর জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সেদিন শত শত ভোটকেন্দ্র খোলার কথা রয়েছে। তবে ভোটাররা নিজ নিজ অঞ্চলের বাইরে থেকেও ভোট দিতে পারবেন। যারা শরণার্থী হিসেবে রাশিয়ায় রয়েছেন, তারাও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এদিকে জাপোরিঝিয়ার রাজধানী এখন পুরোপুরি ইউক্রেনীয়দের নিয়ন্ত্রণে। দোনেৎস্কের মাত্র ৬০ শতাংশ রাশিয়ার দখলে এবং সেখানেও তীব্র লড়াই চলছে। লুহানস্কের বেশিরভাগ অবশ্য রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তবে সেখানে তারা কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে।
রুশ বার্তা সংস্থাগুলো বলছে, লুহানস্কে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে, যাতে বলা হচ্ছে, ‘রাশিয়াই এখন ভবিষ্যৎ’।

কী পরিবর্তন হবে?
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইউরি স্যাক বলেন, এই তথাকথিত গণভোট হবে সর্বনাশা। আমরা দেখছি, স্থানীয় লোকজন ইউক্রেনে ফিরে আসার পক্ষে এবং সেজন্যেই এসব এলাকায় আমরা এত গেরিলা প্রতিরোধ দেখছি।

তবে যাই ঘটুক, ইউক্রেনের সরকার বলছে, কোনো কিছুই আসলে বদলাবে না এবং তাদের বাহিনী এসব অঞ্চল মুক্ত করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে।

রাশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক আলেক্সান্ডার বাউনভ বলেন, অধিকৃত অঞ্চলকে রুশ অঞ্চল বললেই তো আর ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে ঠেকানো যাবে না। তবে এর মাধ্যমে হয়তো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা স্থানীয় জনগণের কাছে একটি বার্তা পাঠানো যাবে।

ক্রেমলিন আশা করছে, মস্কো যেসব এলাকাকে নিজ দেশের সীমানা বলে ঘোষণা করেছে, সেখানে হয়তো পশ্চিমারা নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা নিয়ে দ্বিধায় ভুগবে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়াকে রক্ষায় তার হাতে যত উপায় রয়েছে, তার সব ব্যবহার করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন, যা বেশ উদ্বেগজনক। রাশিয়ার নিরাপত্তা কাউন্সিলের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, রাশিয়ার সীমানাভুক্ত করা অঞ্চলগুলো প্রতিরক্ষায় পরমাণু অস্ত্রও ব্যবহার করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ‘পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি এ প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের আগের অবস্থান পুর্নব্যক্ত করে বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের ভূমি যতই নিজের বলে দাবি করুক, সেটি রক্ষার জন্য ইউক্রেনের যে অধিকার, তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।