শহীদ জুনায়েদের বাবা
আমাদের রাস্তাঘাটে মেরে ফেললে কি বিচার হবে, যেমন হাদিরে মারছে
‘ওরা যদি আমাদের রাস্তাঘাটে মেরে ফেলে তাহলে কি বিচার হবে?’ যেমন হাদিরে (শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি) মারছে। কেউ ধরতে পারে নাই, মরছে না? এরকম আমাদের মারতে তো ছয়-নয় ব্যাপার ওদের জন্য।’
এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় জুনায়েদসহ ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় জুনায়েদের বাবা এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ জামাল বলেন, ‘আসামিদের যে শাস্তি দিয়েছে, তাতে তো বেশি সময় লাগবে না বের হয়ে আসতে।’
তিনি বলেন, ‘আমার জুনায়েদ ক্লাস সেভেনে পড়তো। একটা ছোট্ট শিশু। আজকের এই রায়টা শুইনা আমি খুব বিস্মিত হয়ে গেছি, আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমরা কি বলবো, আমার তো কোনো ভাষা নাই।’
আরও পড়ুন
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
৩ বছরের কারাদণ্ড কি যৌক্তিক কোনো রায় হয়েছে, প্রশ্ন শহীদ পরিবারের
শেখ জামাল বলেন, ‘বাবা হিসেবে বলছি, আমার নিজের কাছেই খারাপ লাগছে যে ক্লাস সেভেনে পড়া একটা বাচ্চা, ছোট্ট বাচ্চা। তার মাথায় এভাবে গুলি করে এদিক দিয়া গুলি করে অন্যদিক দিয়ে বের করে দিছে। এটা কি রায় দিলো? এতটা দিন আমরা নিজেদের বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুইরা এই পর্যায়ে আসছি। আজকের এই রায় শোনার পরে...,মনে হয় না...। ওর মা, (শহীদ জুনায়েদের মা) আসতে পারে নাই। ওর মা আসতে পারে নাই, আজ এলে হয়তো জানতো। ওর মাকে আমি কি জবাব দেবো?’
তিনি বলেন, ‘আমার একটা ছেলে ছিল। একটা মাত্র ছেলে, রায়টাতে আমি খুশি না, সন্তুষ্ট হই নাই। মনের মধ্যে অনেক জ্বালা, আমার অনেক যন্ত্রণা। সন্তানের যে খুনি তার ভিডিও দেখে আমি ভুগতেছি, আমার যে কী রকম লাগে প্রতিটা রাত। আমরা ঘুমাইতে পারি না। আমরা এখন চলাফেরায় রীতিতো ভয় পাই যে, আমাদের পরবর্তী স্টেপগুলো কী আসতে পারে? কী হবে আমাদের?’
তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন, ‘আমাদের জানের কোনো নিরাপত্তা নাই। কেউ আমাদের এই ব্যাপারে কোন সহযোগিতা করছে না। যেই শহীদ পরিবারগুলো রাস্তাঘাটে চলাফেরা করে, কোন দিন কোন এক্সিডেন্ট হয়ে যায়। আমি সেদিন তাজুল ইসলাম (চিফ প্রসিকিউটর) স্যারের কাছে বলছি, স্যার আমাদের প্রোটেক্টর জন্য কিছু দেন। স্যার আপনারা তো এক-দুইজন গানম্যান রাখেন, কিন্তু শহীদ পরিবারের নিরাপত্তা কোথায়?’
সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শহীদ জুনায়েদের বলেন, ‘আমাদের সাংবাদিক ভাইদের প্রশ্ন করলাম যে শহীদ পরিবারগুলো কি এভাবে থাকবে? তাদের অবহেলা করা হবে? আমরা প্রশাসনের অনেক জায়গায় যাই। শহীদ পরিবারদের কোনো মূল্যায়ন করে না, দাম দেয় না।’
তিনি বলেন, ‘মনে হয় যেন আমার সন্তান একটি নতুন সূর্য, একটি নতুন বাংলাদেশ আনার পর একটা অপরাধ করে ফেলেছে। আজ কী রায় দিলো আদালতে বলেন আপনারাই, বলেন প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা। দোয়া চাই আপনাদের কাছে। সুষ্ঠু বিচার আমরা চাই। যারা পালায়া গেছে তাদের মৃত্যুদণ্ড দিছে। আর যারা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে তাদের দিছে তিন বছর সাজা।’
হাঁটু গেড়ে, বসে ও শুয়ে গুলি করা কনস্টেবল সুজনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চানখাঁরপুল হত্যা মামলায় যে কয়টি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে দেখানো হয়েছে, প্রায় সবকটি ভিডিওতে তাকে শুয়ে-হাটুঁ গেড়ে গুলি করতে দেখা গেছে। গুলি করার পর কেউ পড়ে গেলে লাগছে, লাগছে বলে হাসতে দেখা গেছে। আজ সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে কনস্টেটেবল সুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সেদিন বৃষ্টির মতো গুলি করা হয়। ঘটনাস্থলে ৪০-৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে চারজনের হাতে চাইনিজ রাইফেল, ১৪ জনের কাছে ছিল শর্টগান, দুজনের হাতে এসএমজি ছিল। যাই হোক সুজনের রাজ কপাল।’
‘আমরা আজকের এ রায় ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি’ বলেও ক্ষোভ জানান তিনি। বলেন, ‘আশা করছি রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন এবং সুজনের মতো গণহত্যাকারীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থা করবেন। সঠিক বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।’
এফএইচ/ইএ