হামের ঝুঁকিতে স্কুলপড়ুয়া শিশু, অভিভাবকদের করণীয়
স্কুলগামী শিশুরা প্রতিদিনই এক ধরনের সামাজিক পরিসরে প্রবেশ করে; যেখানে একসঙ্গে বসা, খেলা, খাওয়া, গল্প করা সবকিছুতেই থাকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আর এই ঘনিষ্ঠতাই কখনো কখনো হয়ে ওঠে সংক্রমণের বড় কারণ। সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা। ফলে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণ সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও দ্রুত জ্বর, চোখ লাল হওয়া, শরীরে র্যাশ এমনকি জটিল অবস্থায় নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যাও তৈরি করতে পারে। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের কী করা উচিত, কীভাবে শিশুকে নিরাপদ রাখা সম্ভব জেনে নেই।
কেন স্কুলগামী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে?
স্কুল এমন একটি জায়গা, যেখানে অনেক শিশু একই পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটায়। একটি শিশুর শরীরে ভাইরাস থাকলে খুব সহজেই তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে একই বেঞ্চে বসা, খেলাধুলার সময় শারীরিক সংস্পর্শ, খাবার বা পানির বোতল শেয়ার করা, হাঁচি-কাশির সময় সঠিক শিষ্টাচার না মানা-এসব কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
শিশুকে স্কুলে পাঠানোর আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
- শিশুর শরীরে জ্বর আছে কি না
- হালকা কাশি বা নাক দিয়ে পানি পড়ছে কি না
- চোখ লাল বা পানি পড়ছে কি না
- ত্বকে কোনো অস্বাভাবিক র্যাশ দেখা যাচ্ছে কি না
এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলেও শিশুকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাড়িতে বিশ্রাম দেওয়াই ভালো। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
স্কুলে যাওয়ার সময় শিশুর সুরক্ষায় করণীয়
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি শেখান: শিশুকে শেখান হাঁচি বা কাশির সময় মুখ ঢাকতে, নিয়মিত হাত ধুতে, অন্যের খাবার বা বোতল ব্যবহার না করতে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করুন: প্রতিদিন পরিষ্কার ইউনিফর্ম পরানো, পানির বোতল ও টিফিন বক্স জীবাণুমুক্ত রাখা, ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়মিত পরিষ্কার করা।
পুষ্টিকর খাবার দিন: শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার (গাজর, পেঁপে, শাকসবজি), ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি, হালকা, সহজপাচ্য খাবার।
এ বিষয়ে বক্ষ ব্যাধির শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, অপুষ্ট শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক হিসেবে বিবেচিত হয়। হামের চিকিৎসায় পুষ্টিকর খাবার, তরল খাবার বেশি করে দিতে হয়। জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ দিতে হয়।
টিকা: সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়
হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা হলো টিকাদান। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুর টিকা নেওয়া থাকলেও অভিভাবকরা তা নিশ্চিত নন বা ডোজ সম্পূর্ণ হয়নি। এক্ষেত্রে শিশুর টিকাদান কার্ড পরীক্ষা করুন, প্রয়োজনে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা সম্পন্ন করুন, টিকা নিয়ে কোনো গুজব বা ভয়কে গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ টিকা নেওয়া থাকলে হামের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় এবং আক্রান্ত হলেও জটিলতা কম হয়।
স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
অভিভাবকদের শুধু ঘরে বসে সতর্ক থাকলেই হবে না, স্কুলের সঙ্গেও সমন্বয় জরুরি। স্কুলে কোনো শিশু আক্রান্ত হলে দ্রুত জানানো হচ্ছে কি না, ক্লাসরুম পরিষ্কার রাখা হচ্ছে কি না, অসুস্থ শিশুদের স্কুলে আসা নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ে খোঁজ রাখুন এবং প্রয়োজনে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।
শিশুর মানসিক দিকেও নজর দিন
হামের মতো সংক্রামক রোগের সময় শিশুরা ভীত বা অস্থির হয়ে পড়তে পারে। ‘তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে’ এমন ভয় দেখানো ঠিক নয়। বরং সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব বোঝান, অসুস্থ হলে তা সাময়িক এই আশ্বাস দিন। শিশুর মানসিক স্বস্তি তার দ্রুত সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- কয়েকদিন ধরে থাকা বেশি জ্বর থাকা
- শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত কাশি
- শরীরে র্যাশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়া
- খাওয়ায় অনীহা বা দুর্বলতা
আরও পড়ুন:
- ভরসার নাম চিকিৎসক, চ্যালেঞ্জেরও শেষ নেই
- হামের সংক্রমণ ঠেকাতে যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
- টিকা বা ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে? কেন এটি এত জরুরি
স্কুল থেকে ফেরার পর শিশুর যত্ন যেভাবে নিবেন
- হাত-মুখ ভালোভাবে ধোয়া
- বাইরে ব্যবহৃত কাপড় আলাদা রাখা
- হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করানো (যদি প্রয়োজন হয়)
- পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা
সচেতনতা ও অভ্যাসই হতে পারে সুরক্ষার চাবিকাঠি
হাম প্রতিরোধের জন্য আলাদা কোনো জাদুকরী উপায় নেই। আছে শুধু সচেতনতা, সঠিক তথ্য আর নিয়ম মেনে চলা। শিশুকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু তাকে নিরাপদ রাখতে ছোট ছোট অভ্যাসই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু রোগ হলে চিকিৎসা নেওয়া নয়, বরং তার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা। কারণ একটি সচেতন সিদ্ধান্তই আপনার শিশুকে বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, হামের কোন এন্টিভাইরাল ওষুধ নাই। মনে রাখবেন, হামে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেবল এন্টিবায়োটিক দিতে হয়।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের শুধু ফেব্রুয়ারি-মার্চে ৫৬০ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। যার মধ্যে চলতি মাসে ১৯ জনসহ এখন পর্যন্ত ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ
জেএস/
