রোজায় বাড়তি ক্যালরি নয়, বেছে নিন পুষ্টি
সংযমের মাস রমজান। তবে এই সময় ইফতারের টেবিলে থাকে বাহারি সব খাবার। বিশেষ করে নানা ধরণের ভাজাপোড়া, মিষ্টি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার। এসব খাবারের লোভ সামলানো অনেক কঠিন। আর এতেই বাধে বিপত্তি। সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি কিংবা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অথচ একটু সচেতন হলেই রোজার সময়টাকে স্বাস্থ্য ঠিক রাখার সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
বাড়তি ক্যালরির বদলে যদি পুষ্টিকর, সুষম ও পরিমিত খাবার বেছে নেওয়া যায়, তাহলে শরীর থাকবে সতেজ, শক্তি থাকবে স্থিতিশীল এবং ওজনও থাকবে নিয়ন্ত্রণে। তাই রোজায় খাবারের পরিমাণ নয়, গুণগত মানেই হোক প্রধান গুরুত্ব। চলুন তাহলে জেনে নেই রমজানে কোন খাবারগুলো ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক এবং কীভাবে সেগুলো খাদ্যতালিকায় রাখবেন।
শাকসবজি: কম ক্যালরি, বেশি তৃপ্তি
শাকসবজি ওজন নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান সহায়ক। এতে ক্যালরি কম কিন্তু আঁশের পরিমাণ বেশি। আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়। যেভাবে খাবেন-
- ইফতারে শসা, টমেটো, গাজর, লেটুস দিয়ে সালাদ রাখতে পারেন।
- সেহরিতে ভাজির বদলে হালকা সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা সবজি রাখুন।
- ডাল বা স্যুপে বিভিন্ন সবজি যোগ করলে পুষ্টিগুণ বাড়ে।
- শাকসবজি শরীরের হজম প্রক্রিয়া ভালো রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে, যা রোজায় অনেকেরই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
ফলমূল: প্রাকৃতিক মিষ্টিতে স্বাস্থ্যকর সমাধান
ইফতারে মিষ্টি, শরবত বা ভাজাপোড়ার বদলে ফল খাওয়া হতে পারে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত। ফলে প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। তাই ইফতারে রাখতে পারেন তরমুজ, আপেল, পেয়ারা, কমলা, পেঁপে, খেজুর।
এছাড়া ইসলামে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা সুন্নত। শুধু ইসলামিক দিক দিয়েই নয়, এতে রয়েছে সুস্থ থাকার মন্ত্র। খেজুরে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ থাকে, যা দ্রুত শক্তি জোগায়। তবে অতিরিক্ত খেজুর না খাওয়াই ভালো। ফল শরীরকে হাইড্রেট রাখে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমায়।
আরও পড়ুন:
- ইফতার থেকে রাতের খাবারের বিরতি কত হওয়া উচিত?
- ওজন কমাতে কলা, বন্ধু না শত্রু?
- ইফতারে কোন ধরণের খাবার রাখা স্বাস্থ্যর জন্য উপকারী?
প্রোটিন: ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী উপাদান
প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয় এবং পেশী গঠনে সহায়তা করে। রোজার সময় শরীরের শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন গ্রিল বা সেদ্ধ মুরগি, মাছ, ডিম, ডাল, ছোলা। ইফতারে ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা সেদ্ধ প্রোটিন গ্রহণ করলে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমা কমে। সেহরিতে ডিম বা ডাল খেলে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না।
পূর্ণ শস্য: দীর্ঘস্থায়ী শক্তির উৎস
সাদা ভাত বা পরিশোধিত ময়দার রুটি দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং দ্রুত ক্ষুধা তৈরি করে। এর বদলে পূর্ণ শস্য গ্রহণ করলে শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়। উপকারী শস্য ব্রাউন রাইস, আটার রুটি, ওটস, লাল চাল। এসব খাবারে আঁশ বেশি থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না। ফলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।
বাদাম ও বীজ: অল্পতেই তৃপ্তি
বাদাম ও বিভিন্ন বীজ স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও আঁশের ভালো উৎস। অল্প পরিমাণেই পেট ভরে যায়। খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন কাঠবাদাম, আখরোট, কাজুবাদাম, চিয়া বীজ, তিসি বীজ। ইফতারে ভাজাপোড়ার বদলে একমুঠো বাদাম খেলে তা শক্তি দেয় এবং অতিরিক্ত স্ন্যাকিং কমায়। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি, কারণ বাদামে ক্যালরি তুলনামূলক বেশি।
পর্যাপ্ত পানি: মেটাবলিজম সচল রাখার চাবিকাঠি
রোজায় ডিহাইড্রেশন হলে অনেক সময় শরীর ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার সংকেত গুলিয়ে ফেলে। ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়া হয়।
পানি পানের কৌশল
- ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন।
- একবারে বেশি পানি না খেয়ে বিরতি দিয়ে পান করুন।
- অতিরিক্ত চিনি যুক্ত শরবত এড়িয়ে চলুন।
- পানি শরীরের বিপাকক্রিয়া সচল রাখে এবং হজমে সহায়তা করে।
যেসব অভ্যাস মানলে ওজন বাড়বে না
- ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি এড়িয়ে চলুন।
- ধীরে ধীরে খাবার খান-তাড়াহুড়ো করলে বেশি খাওয়া হয়ে যায়।
- কখনো সেহরি বাদ দেবেন না।
- ইফতারের পর ২০–৩০ মিনিট হালকা হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
- ঘুম ঠিক রাখুন, অপর্যাপ্ত ঘুম ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
রমজান শুধু আত্মিক পরিশুদ্ধির সময় নয়, বরং শরীরকে সুস্থ রাখারও সুযোগ। সঠিক খাবার নির্বাচন, পরিমিত আহার এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম এই তিনটি বিষয় মেনে চললে রোজার মাসেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টির প্রলোভন এড়িয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। তাহলেই মাস শেষে নিজেকে আরও হালকা, ফিট ও প্রাণবন্ত অনুভব করবেন।
তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন
জেএস/