মায়াজাল

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:০১ পিএম, ১৫ মে ২০২১ | আপডেট: ০৫:০১ পিএম, ১৫ মে ২০২১

সরোজ মেহেদী

‘শীত-পিঠা-পাখি-পৃথিবী-আহা।’ রহমান সাহেবের চশমার কাচ যেন ঝাপসা হয়ে আসে। তিনি জানালা ধরে পলকহীন বাইরে তাকিয়ে। ইথারে ভাসছে মাগরিবের আজানের সুর। একটা পাখি বিদ্যুতের এ তার থেকে ও তারে যাচ্ছে। কিছু পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ছে। তারাও কি নীড়ে ফিরছে রহমান সাহেবের মতো? তাদেরও কি কবির মতো, সব পাখি ঘরে ফিরে, সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন!

দূর নীলিমায় রহমান সাহেবের আনমনা দৃষ্টি। পাখিদের মধ্যে কোনো তাড়া নেই। তাড়নাও নেই বোধহয়। মানুষের জীবন কি পাখির মতো সুখের হয়? মানুষ কি সারাটা জীবন চেষ্টা করেও পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে পারে? মানুষ পারে না বলেই হয়তো সে মানুষ! মাগরিবের ওয়াক্ত চলে যায়, সে খেয়াল নেই তার। শীতের সকাল ধীরে শুরু হয়। আর সন্ধ্যা আসে বৃষ্টি রাতে হঠাৎ চমকানো বিজলীর মতো। দিন যেন দেখতে দেখতে রাতের পেটে হারিয়ে যায়। কুয়াশা পড়া শুরু হলে বহুদিন সূর্যের দেখাও মেলে না। নগর ছেড়ে গাঁয়ের দিকে যান বলেই হয়তো এখনো শীতের সৌন্দর্য অনুভব করেন তিনি। শীতের পুরোটা সময় বাসেই মাগরিবের নামাজ পড়তে হয়। তাও ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। প্রতিদিন সকালে তিনি সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সন্ধ্যায় কল্যাণপুরের নিজ কুটিরে ফেরেন। বাস এখন বলিয়ারপুরে। সাই সাই করে ছুটে চলছে। পাখপাখালিদের পাখিপনা তাকে হিংসুটে করে তুলে। পাখি জীবন, কি সুখেরই না! ‘এমন যদি হত, আমি পাখির মত/উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ’।

বয়সভেদে শীতের আগমনও বোধহয় আগে পরে ঘটে। রহমান সাহেবের গলাব্যথা ক’দিন ধরে। শীতের হালকা সোয়েটারও পরতে হচ্ছে। অথচ একটা সময় ছিল শীত কেটে যেত দস্যিপনায়। শীতের রাতজুড়ে আড্ডা নেমে আসত গ্রামজুড়ে। গ্রামের ছেলেরা দলবেঁধে সবজি ক্ষেতে যেত। আলু চুরি করে এনে পুড়িয়ে খেত, সালাদ বা ক্ষিরার ভর্তা বানিয়ে হট্টগোল লাগাত। ক্ষেতের মালিক দেখে ফেলে বিচার বসাত। ছেলেরা দলবেঁধে আবার চুরি করত। নতুন ধান উঠলে ধান কুড়ানো দল গঠিত হত। তারপর চলত হইহই রইরই চড়–ইভাতি। তিনি আবার চশমার কাচ মোছেন। আহা! দেখতে দেখতে কীভাবে চলে গেল জীবনের ষাটটা বছর। সত্তর বছর হায়াৎ পেলে বাকি থাকে দশ! তারপর আব্দুর রহমান নামে আর কেউ থাকবে না। এভাবে বাসে করে বাসায় ফিরতে ফিরতে কেউ পাখি দেখে পুলকিত হবে না। রহমানের জায়গাজুড়ে বসে থাকবে আরেক রহমান। তারপর আরেকজন। রহমানরা বুঝতে চায় না, তাদের হারিয়ে যেতে হয়। পৃথিবী ঠিকই থেকে যায় তার মতো। কেবল রহমানরা আসে আর যায়।

শৈশবের কথা বড় মনে পড়ে যায়। শৈশবের শীত আর শীতে চলা নানা উৎসবের কথা। একদিন মানুষ হবেন বলে বাড়ি ছেড়েছিলেন রহমান সাহেব। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে বুঝতে পারেন না, কী হলেন আসলে? সারাজীবন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়িয়েছেন। ছাত্র পড়াতে পড়াতে যে বদ অভ্যাসগুলো মানুষের তৈরি হয় রহমান সাহেবের সেগুলো নেই বলেই ধারণা তার। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই গার্মেন্ট কারখানার, কর্পোরেট অফিসের না বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরে। অবশ্য তার চোখে কারখানার শ্রমিক আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্যও ধরা পড়ে না। দু’জনই শ্রমিক। শোষিত শ্রেণির একজন। মনিবের গোলাম এটাই তাদের বড় পরিচয়। তারা একসাথে ভিন্ন পরিচয়ে পেটের জন্য লড়ে যায়। পেটের জন্য যখন তখন পিঠ পেতে দেয়ার চর্চা করে যায়।

অথচ শৈশবে কত স্বপ্ন ছিল! দু’টো হাতে যেন দু’টো ডানা ঝুলানো ছিল। খালি উড়তেই মন চাইত। এখন তিনি ডানাভাঙা পাখি। যে প্রস্থানের প্রহর গোণে। আবছা অন্ধকারে বাসে বসে থেকে থেকে স্মৃতিরা যেন উসকে দেয় রহমান সাহেবকে। চাচাদের কথা মনে পড়ে। মামার কথা, খালার কথা, ফুপুর কথা। মামাতো-খালাতো, চাচাতো ভাই-বোনদের কথা। শীতের রাতে সবার একসাথে আগুন পোহানোর কথা। রাত জেগে মা-চাচিদের ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া তৈরি আর শেষ রাতে চুলা থেকে তোলা গরম গরম পিঠা খাওয়ার কথা। আহা শৈশব! রহমান সাহেব আবার চশমার কাচ মুছেন। আহা শৈশব! একটা দীর্ঘশ্বাস যেন ঝড় তুলে যায় মনে। পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ যেন তার বুকে ভাঙনের ঢেউ তুলে। স্মৃতি তাকে বড় কাতর করে তুলে।

অনেক কিছু ভুলে থাকতে চান তিনি। ভুলতে চান বলে গ্রামে যান না বহু বছর। গ্রামের দু’একজনের সাথে কথা হয় না তা নয়। নিজের ভাতিজারা খোঁজ-খবর নেয়। রহমান সাহেবের জমিজমাগুলো তারা করে খায়। নিজের পৈতৃক ভিটাটাও তাদের দখলে। কখনো এসবের খোঁজ-খবর নেয়া হয় না। এসবে তার মন সায় দেয় না। গাঁয়ে ফিরতেও প্রবৃত্তি হয় না। রহমান সাহেবের দুই ভাই বহুবার তাকে গাঁয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফল হয়নি কিছু। গাঁয়ের দিকে তাকালে যেন পুরো দুনিয়াটা অর্থহীন মনে হয়। তিনি পারেন না, শৈশবের আদর স্নেহ পাওয়া মানুষগুলোর একে একে লাশ হয়ে যাওয়া মেনে নিতে। পারেন না একটা সময় মানুষে মানুষে ভরপুর থাকা বাড়িটাতে গিয়ে কথা বলার মানুষ খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টায় মানিতে নিতে। পারেন না বলেই জেঠা ছাড়া, চাচা ছাড়া বাড়িটাকে তার কাছে মনে হয় মধ্যরাতের গোরস্থান। বাড়ির কথা মনে হলে তার বুকটা হুহু করে উঠে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। শৈশব যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ছোবল মারে।

রহমান সাহেব ভুলতে পারেন না সেসব দিন। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে তার সংগ্রাম। এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি। ও ডাক্তার...কসাই আর ডাক্তার একইতো নয়/কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান। ভুগতে ভুগতে একদিন বাবা মারা গেলেন। তার তিনদিনের মাথায় মা। এরপর আর ফেরেননি গাঁয়ে। আর না। মায়ের লাশটা কবরে নামিয়ে দিয়েই তিনি বাড়ি ছাড়েন। তারপর আর ও মুখো হননি। আজকাল খুব মনে পড়ে গ্রামকে। দু’চোখ বুজলেই কতগুলো মুখ ভেসে উঠে। তাদের সাথে নিজে নিজে কথা বলেন রহমান সাহেব। কতো স্মৃতি এই গাঁয়ে। গাঁয়ের মানুষদের সাথে। চিরচেনা গাঁয়ের পথ, চিরচেনা চির তরুণ স্বজনের দল। সেই দামাল ছেলেবেলা। দুরন্ত কৈশোর। আহা! আহারে আহারে আহা! আহারে জীবনের মায়া!

তার চোখে উছলে উঠে শৈশব। শৈশবের যৌবনা মায়ের কথা। মা’র শরীরে যেন ছিল দশজন মানুষের শক্তি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতেন মা জেগে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও। সেই থেকে তার মনে হতো মায়েরা কখনো ঘুমান না। বড় হয়ে জেনেছেন ‘সুপারম্যান’ বলে কিছু একটা আছে পৃথিবীতে। তারা দেখতে মানুষের মতো কিন্তু ঠিক মানুষ না। ‘সুপারম্যান’ কখনো তিনি দেখেননি তবে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, মায়েরা আসলে ‘সুপারওইমেন’। তারা নারীর মতো দেখতে কিন্তু নারী নন। নারী বা মানুষের চেয়ে বেশি কিছু। মায়েরা আসলে মানুষ নন। মা।

আজ কতো বছর পর যেন সব স্মৃতি এসে তাকে ঝাঁপসা করে দেয়। শীতের রাতে মার হাত থেকে নিয়ে ধোঁয়া ওঠা মেরা পিঠা খাওয়ার কথা। সকালে খেতে খেতে মক্তবে যাওয়ার কথা। ছেলের মেরা পিঠা প্রিয় বলে মা সারা বছর ধরেই বানাতেন। অথচ আরেকটা শীত চলে যায়। তারপর বেজে উঠবে আরেকটা বসন্তের বীন। রহমান সাহেবের কথা কি কারো মনে পড়ে? তার জন্য টনটন করে কারো বুক! একাকি এই জীবনে এমন কোন মানুষ কি তিনি পেলেন? কাছের বন্ধু-বান্ধবদের কেউ কেউ নেই। বড় ভাই-বোনদের হারিয়ে যাওয়ার লিস্টটা বেশ লম্বা। যারা বেঁচে আছেন তাদের অনেকেই আর সচল নন। কে নেয় কার খোঁজ?

তিনি আনমনে জানালা ধরে বাইরের অন্ধকার দেখেন। একসময় বাস এসে কল্যাণপুর থামে। বাসট্যান্ড থেকে বাসার দিকে এগিয়ে যান। একা বাসায় মানুষ বলতে কাজের খালা। প্রতিবেশীদের সাথেও সদ্ভাব তার। খালা তিন বেলা রান্না-বান্না করেন। এখানেই ঘুমান। বড্ড ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাঁটছেন রহমান সাহেব। গাঢ় অন্ধকারে প্রসারিত গলিতে নিজের ছায়া খুঁজতে খুঁজতে হাঁটেন। কল্যাণপুরের এই অঞ্চলটা বেশ নীরব। চোর-বাটপারদের উৎপাতও কম। গলির রাস্তাগুলোও বেশ চওড়া। রাত-বিরাতে কুত্তার ডাকে জাগতে হয় না এটা ভাগ্যি। বাসার সামনে যেতেই দারোয়ান এগিয়ে আসে। ‘স্যার, গাঁও থেইক্কা আফনের বাতিঝা আইছে কয় ঘণ্টা।’ ভাতিজার হাতে একটা ব্যাগ। চাচার জন্য পিঠা নিয়ে এসেছে। রহমান সাহেব ঝাপসা চোখে ব্যাগের ভেতরে তাকান। মায়াময় এক মহিলা মেরা পিঠা হাতে বসে। তিনি চশমার কাচ মুছে আবার তাকান। চিনতে অসুবিধা হয় না। মা। রহমান সাহেব উহ্ করে ওঠেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার তাকান। মা রহমাইন্নারে পিঠা নিতে তাড়া দিচ্ছে। তিনি আবার তাকান। সত্যি সত্যিই মা। মা-মা। রাব্বির হামহুমা কামা রব্বাই আনি সগিরা...

ভাতিজাকে কাছে টেনে মাথায় হাত বোলান রহমান সাহেব। চোখ দুটো শূন্যে তুলে জানতে চান, তোর দাদা-দাদির কবরটা পরিষ্কার আছেনি রে? জিয়ারত করে তোর বাপ! ভাতিজা জবাব দেয়, ‘চাচা আব্বা বুয়ারে হপ্নে কানতে দেকছে। বুয়া কানতে কানতে কইছে, আমার রহমান কতদিন দইরা পিডা খায় না। শীত যায়, আমার পিডাপাগল পুলাডা পিডা ছারা কেমনে থাহে!’ ভাতিজার গলা আর্দ্র। রহমান সাহেব আবার ভাতিজার মাথায় হাত বোলান। তার কাছে পৃথিবীটা আরও বেশি শূন্য মনে হয়। নিজের অজান্তেই তিনি আম্মা, আম্মা বলে চোখ মোছেন...

এই গল্পটি জাগো নিউজের ঈদ সংখ্যা ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে। ঈদ সংখ্যাটি পাওয়া যাচ্ছে অথবাডটকমে।

এসএইচএস/এমএস

জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে বুঝতে পারেন না, কী হলেন আসলে? সারাজীবন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়িয়েছেন। ছাত্র পড়াতে পড়াতে যে বদ অভ্যাসগুলো মানুষের তৈরি হয় রহমান সাহেবের সেগুলো নেই বলেই ধারণা তার। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই গার্মেন্ট কারখানার, কর্পোরেট অফিসের না বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]