মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাগজে নয়, বাস্তবে নিশ্চিত করা জরুরি

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫১ পিএম, ০৩ মে ২০২৬

বাংলাদেশে গণমাধ্যম শুধু তথ্যের বাহক নয়, এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার শেষ ভরসাও। তবু বাস্তবতা কঠিন ক্ষমতার চাপ, আইনি ঝুঁকি, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং ডিজিটাল নজরদারির মধ্যে সাংবাদিকতা প্রায়ই সত্য প্রকাশের আগেই থমকে যায়। প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি এমন এক গণতন্ত্র চাই, যেখানে সত্য প্রকাশের আগে অনুমতি নিতে হয়।

সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো যখন আত্ম-সেন্সরশিপে বাধ্য হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নাগরিকের জানার অধিকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে টিকিয়ে রাখতে হলে সমালোচনাকে শত্রু হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। কারণ সমালোচনা গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়। এটি তার শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

আজকের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন স্বাধীন সম্পাদনা নীতি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা যা ভয় নয়, আস্থা গড়ে তোলে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও ক্লিকবেইট এড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। নইলে স্বাধীনতার দাবিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে অঙ্গীকার হওয়া উচিত সত্য চেপে রাখা নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তা সামনে আনতে হবে। ভয়কে স্বাভাবিক না মেনে পেশাগত সততা রক্ষা করতে হবে। কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিক স্বাধীনতার ভিত্তি।

দিবসটি উপলক্ষে কথা বলেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রাইসুল ইসলাম। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক মো. আশিকুজ্জামান আশিক

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাগজে নয়, বাস্তবে নিশ্চিত করা জরুরিজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রাইসুল ইসলাম, ছবি: জাগো নিউজ

জাগো নিউজ: বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে আমরা কী প্রত্যাশা করি?

রাইসুল ইসলাম: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে কেবল সেন্সরশিপমুক্ত পরিবেশ নয়। এমন একটি কাঠামো, যেখানে সাংবাদিকরা ভয়ভীতি, রাজনৈতিক চাপ বা করপোরেট প্রভাব ছাড়াই সত্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করতে পারেন। এটি নাগরিকের জানার অধিকার রক্ষার মৌলিক শর্ত এবং গণতন্ত্রের কার্যকর অস্তিত্বের পূর্বশর্ত।

 

জাগো নিউজ: বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবস্থা কেমন?

রাইসুল ইসলাম: বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম আজ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রযুক্তির বিস্তার তথ্যপ্রবাহ ত্বরান্বিত করলেও, একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং আইনি সীমাবদ্ধতা বেড়েছে। ফলে স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা সংকুচিত।

জাগো নিউজ: রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বা ফ্রিডম হাউজের সূচকগুলো কীভাবে দেখেন?

রাইসুল ইসলাম: রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং ফ্রিডম হাউজ এই দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস প্রায় ১৮০টি দেশের গণমাধ্যম পরিবেশকে রাজনৈতিক প্রভাব, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক পরিবেশ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা—এই পাঁচটি মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে ফ্রিডম হাউজ দেশগুলোর মতপ্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে তাদের ফ্রি, পার্টলি ফ্রি এবং নট ফ্রি এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করে।

সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক দেশেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ এই দুই সূচকে সাধারণত মধ্যম থেকে নিম্ন অবস্থানে থাকে, যা আংশিক স্বাধীনতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব সূচক মূলত প্রবণতা বোঝার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং স্থানীয় বাস্তবতার সব দিক পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও করতে পারে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?

রাইসুল ইসলাম: বাংলাদেশে গণমাধ্যম আংশিক স্বাধীনতার মধ্যে কাজ করে। সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানাগত স্বার্থ এবং আইনি কাঠামোর কারণে স্বাধীনতার পূর্ণ প্রয়োগ সীমিত।

আরও পড়ুন
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ
কার্যকর গণমাধ্যমের জন্য দরকার অযাচিত প্রভাব থেকে মুক্তি: এমএফসি
মুক্ত গণমাধ্যমের প্রভাবকে স্বাগত জানায় ইইউ

জাগো নিউজ: সাংবাদিকদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?

রাইসুল ইসলাম: সাংবাদিকরা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ, আত্ম-সেন্সরশিপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং আইনি ঝুঁকি। এই সবকিছু মিলিয়ে একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি হয়, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সীমিত করছে।

জাগো নিউজ: সাইবার সুরক্ষা আইন গণমাধ্যমের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?

রাইসুল ইসলাম: এই আইনের কিছু ধারা বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে মামলা-ভীতি ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জাগো নিউজ: সরকার ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক আপনি কীভাবে দেখেন?

রাইসুল ইসলাম: এটি একটি দ্বৈত সম্পর্ক একদিকে সহযোগিতা, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ। উন্নয়নমূলক প্রচারে সরকার গণমাধ্যমকে অংশীদার হিসেবে চায়, কিন্তু সমালোচনামূলক অবস্থানকে সবসময় সহনীয়ভাবে গ্রহণ করা হয় না।

জাগো নিউজ: সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হয়রানি কতটা উদ্বেগজনক?

রাইসুল ইসলাম: এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শারীরিক হামলা, মামলা ও অনলাইন হয়রানি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পেশাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকরা রাজনৈতিক সহিংসতা, স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর চাপ, তথ্যপ্রাপ্তির বাধা এবং ডিজিটাল নজরদারির মতো ঝুঁকির সম্মুখীন হন।

জাগো নিউজ: এই ঝুঁকি কমাতে কী প্রয়োজন?

রাইসুল ইসলাম: সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, দ্রুত বিচার, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।

জাগো নিউজ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি স্বাধীনতা বাড়াচ্ছে?

রাইসুল ইসলাম: আংশিকভাবে হ্যাঁ, তবে এটি নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে। এটি তথ্যপ্রবাহ গণতান্ত্রিক করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব ও বিভ্রান্তির বিস্তার বাড়িয়েছে।

আরও পড়ুন
স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতের দাবি
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ পেছালো বাংলাদেশ
বিশ্বে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

জাগো নিউজ: গুজব ও ফেক নিউজের প্রভাব কী?

রাইসুল ইসলাম: ভুল তথ্য গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট করে তোলে, যা গণতান্ত্রিক আলোচনাকে দুর্বল করে। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্ম অ্যালগরিদম প্রায়ই চটকদার কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে গভীর ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পিছিয়ে পড়ে।

জাগো নিউজ: শক্তিশালী গণমাধ্যমের জন্য কী ধরনের আইন দরকার?

রাইসুল ইসলাম: শক্তিশালী গণমাধ্যমের জন্য এমন আইন দরকার যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাস্তবে সুরক্ষা দেয়। সাংবাদিকদের পেশাগত কাজ যেন অপরাধ না হয়, বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আইন যেন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মাধ্যম হয়, সেটিই মূল বিষয়।

 

জাগো নিউজ: বর্তমান আইনে কী ধরনের সংস্কার দরকার?

রাইসুল ইসলাম: বর্তমান আইনে কিছু ধারার অস্পষ্টতা রয়েছে, যা ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে। ডিজিটাল আইনের মতো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রয়োগ সাংবাদিকদের মধ্যে আত্ম-সেন্সরশিপ তৈরি করে। তাই আইনের ভাষা স্পষ্ট করা, জামিন ও বিচার প্রক্রিয়া সহজ করা, তদন্তে স্বচ্ছতা আনা এবং অপব্যবহার ঠেকাতে স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

জাগো নিউজ: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ভারসাম্য কীভাবে সম্ভব?

রাইসুল ইসলাম: রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ভারসাম্যের জন্য দরকার নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা। একইসঙ্গে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে ভুল তথ্য বা পক্ষপাতদুষ্টতা না ছড়ায়।

জাগো নিউজ: আগামী ৫-১০ বছরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?

রাইসুল ইসলাম: আগামী সময়ে গণমাধ্যম আরও ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। অনলাইন সাংবাদিকতা প্রধান ভূমিকা নেবে। তবে ভুয়া তথ্য, অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল নজরদারির চ্যালেঞ্জও বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতাকে দ্রুত করবে, কিন্তু সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

জাগো নিউজ: তরুণ সাংবাদিকদের জন্য কী পরামর্শ দেবেন?

রাইসুল ইসলাম: তরুণ সাংবাদিকদের জন্য শুধু লেখার দক্ষতা নয়, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা জরুরি। ডেটা সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা জানা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং চাপের মধ্যেও পেশাগত সততা বজায় রাখা।

জাগো নিউজ: সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী এখানে?

রাইসুল ইসলাম: স্বাধীন গণমাধ্যম টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা, নির্ভরযোগ্য উৎস ব্যবহার করা এবং গুজবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দরকার। কারণ সচেতন নাগরিক ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টেকসই হয় না।

এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।