লড়াইয়ের ময়দান

বিশ্বকাপের আইকনিক ভেন্যু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৫৯ পিএম, ১৮ মে ২০২৬

এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে তিন দেশের মোট ১৬টি স্টেডিয়ামে। কিন্তু এই ১৬ স্টেডিয়ামের মধ্যে একটিকে তো ‘আইকনিক ভেন্যু’ হিসেবে পরিচিত হতে হবে। সেই আইকনিক ভেন্যুটাই হচ্ছে- নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। যেখানে ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ ফুটবলের জমজমাট ফাইনাল।

মেটলাইফ স্টেডিয়াম শুধু একটি ফুটবল মাঠ নয়, বরং আধুনিক ক্রীড়া স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত এই বহুমুখী স্টেডিয়ামটি ২০১০ সালে উদ্বোধন করা হয়। নিউইয়র্ক সিটি থেকে মাত্র ৫ মাইল (৮ কিলোমিটার) পশ্চিমে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়াম তৈরি করা হয় পুরনো জায়ান্টস স্টেডিয়ামের পরিবর্তে।

বর্তমানে এটি এনএফএলের দুই দল নিউইয়র্ক জায়ান্টস ও নিউইয়র্ক জেটসের হোম ভেন্যু। স্টেডিয়ামটির নির্মাণ ব্যয় ছিল আনুমানিক ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা উদ্বোধনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়াম হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

মেটলাইফ স্টেডিয়াম ইতোমধ্যেই সুপার বোল এক্সএলভিআইআইআই আয়োজন করেছে। এছাড়া ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচ ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে এখানে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও এই স্টেডিয়াম আয়োজন করবে একাধিক ম্যাচ, যার মধ্যে থাকবে ফাইনালও। ফিফার স্পন্সরশিপ নীতিমালার কারণে বিশ্বকাপ চলাকালে এর নাম ব্যবহার করা হবে ‘নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’ হিসেবে। ৮২ হাজারেরও বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই স্টেডিয়াম নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম এবং এনএফএলেরও বৃহত্তম ভেন্যু।

ইতিহাস

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের জায়গায় আগে যে জায়ান্টস স্টেডিয়াম ছিল, সেটি প্রায় ৩০ বছরের পুরনো হয়ে যাওয়ায় নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। নিউইয়র্ক জেটস প্রথমে ম্যানহাটনে ৮৫ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ওয়েস্ট সাইড স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে চেয়েছিল, যা ২০১২ অলিম্পিকের জন্য নিউইয়র্ক বিডের প্রধান ভেন্যু হিসেবেও ভাবা হয়েছিল। যদিও এর জন্য বিপুল সরকারি অর্থায়নের প্রয়োজন ছিল এবং বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার কারণে ২০০৫ সালে প্রকল্পটি থেমে যায়। এরপর জায়ান্টস ও জেটস যৌথ উদ্যোগে নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।

নকশা ও পরিকল্পনা

স্টেডিয়ামটির নকশা তৈরির সময় স্থপতিদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল- দুই দলের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেও একটি নিরপেক্ষ স্টেডিয়াম তৈরি করা। জায়ান্টস চেয়েছিল স্টিল ও পাথরের ঐতিহ্যবাহী নকশা, আর জেটস চেয়েছিল আধুনিক ধাতু ও কাঁচের ঝকঝকে স্টাইল। তাই ম্যানহাটনের আকাশচুম্বি ভবনের কলাম-টাওয়ার ডিজাইন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্টেডিয়ামের নকশা তৈরি করা হয়।

স্টেডিয়ামের বাইরের অংশে রয়েছে চুনাপাথরের মতো আবরণ, অ্যালুমিনিয়ামের লুভার এবং কাঁচ। অভ্যন্তরীণ আলো খেলার দলের ভিত্তিতে রং পরিবর্তন করে- জায়ান্টস খেললে নীল, জেটস খেললে সবুজ। এই ধারণাটি নেওয়া হয়েছিল জার্মানির মিউনিখের অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনা থেকে।

স্টেডিয়ামের প্রথম সারির দর্শক আসন সাইডলাইন থেকে মাত্র ৪৬ ফুট দূরে, যা এনএফএলের মধ্যে সবচেয়ে কম দূরত্ব। মাঠের ডিজাইন পরিবর্তনে ৪ জনের দুটি দল প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় নেয়। শুরুতে মিডফিল্ডে দলগুলোর লোগো ব্যবহার করা হলেও ২০১০ সালে ডোমেনিক হিক্সনের ইনজুরির পর সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ২০২৩ সালে আবার দলীয় লোগো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়।

২০২৩ সালে এখানে নতুন কৃত্রিম টার্ফ ‘ফিল্ডটার্ফ কোর সিস্টেম’ বসানো হয়, যা খেলোয়াড়দের ইনজুরি কমাতে সহায়ক বলে ধরা হচ্ছে।

ছাদবিহীন স্টেডিয়াম

আধুনিক অনেক স্টেডিয়ামের মতো মেটলাইফে কোনো ছাদ নেই। ছাদ সংযোজনের পরিকল্পনা থাকলেও অর্থায়ন নিয়ে বিরোধের কারণে তা বাতিল হয়। ফলে এনসিএএ ফাইনাল ফোরের মতো ইনডোর বড় ইভেন্ট এখানে আয়োজন করা সম্ভব হয় না।

প্রযুক্তি ও ধারণক্ষমতা

স্টেডিয়ামে রয়েছে ১০টি বিশাল এইচডি এলইডি পাইলন এবং চারটি বড় ভিডিও বোর্ড। ২০২৫ সালে নতুন এইট এমএম হাই-রেজুলেশন এলইডি স্ক্রিন ও ১,০০০-এর বেশি স্পিকারসহ আধুনিক অডিও সিস্টেম সংযোজন করা হয়।

৮২,৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামে রয়েছে ১০,০০৫ টি ক্লাব সিট এবং প্রায় ২১৮টি বিলাসবহুল স্যুট। এনএফএলের সবচেয়ে বড় দর্শকাসনযুক্ত স্টেডিয়াম এটি। দর্শকদের দৃষ্টিসীমা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে আসন বিন্যাস।

লকার রুম ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা

স্টেডিয়ামে মোট চারটি লকার রুম রয়েছে- জায়ান্টস ও জেটসের জন্য দুটি এবং অতিথি দলের জন্য দুটি।

২০১২ সালে ‘সোলার রিং’ প্রকল্প চালু হয়। ১,৩৫০টি সৌর প্যানেল দিয়ে তৈরি এই রিং স্টেডিয়ামের উপরের অংশ ঘিরে রয়েছে। এগুলো এলইডি আলোয় বিভিন্ন রঙে আলোকিত হয় এবং প্রায় ৩৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

বিশ্বকাপের জন্য সংস্কার

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফার চাহিদা পূরণে ২০২৪ সালে স্টেডিয়ামের নিচের অংশে সংস্কার শুরু হয়। মাঠের আকার বাড়াতে চার কোণের কংক্রিট অংশ ভেঙে নতুন মডুলার স্টিল সিটিং ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এতে অতিরিক্ত ১,৭৪০টি স্থায়ী আসন যুক্ত হয়েছে। কাজটি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়- প্রথম ধাপ ২০২৪ সালের মে মাসে এবং দ্বিতীয় ধাপ ২০২৫ সালের মে মাসে শেষ হয়।

 

গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টসমূহ

মেটলাইফ স্টেডিয়াম বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ভেন্যু যা বিভিন্ন ধরণের বড় ইভেন্ট আয়োজন করে

ফুটবল (এনএফএল): এটি ২০১৪ সালে সুপার বোল ৪৮ আয়োজন করেছিল। এটিই ছিল প্রথমবার যখন কোনো ঠান্ডা আবহাওয়ার শহরে ছাদহীন স্টেডিয়ামে সুপার বোল অনুষ্ঠিত হয়।

সকার (ফুটবল): এখানে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ২০১৬ কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিও-র ফাইনাল অন্যতম।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপে এটি ‘নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’ নামে পরিচিত হবে এবং এখানে টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচসহ মোট ৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

পেশাদার কুস্তি: এখানে ২০১৩ সালে রেসলম্যানিয়া ২৯ এবং ২০১৯ সালে রেসলম্যানিয়া ৩৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কনসার্ট: টেলর সুইফট, বিয়ন্সে, কোল্ড প্লে এবং বিটিএস (বিটিএস)-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত তারকাদের কনসার্ট এখানে লক্ষাধিক দর্শক সমাগম ঘটিয়েছে।

নামকরণ ও পুরস্কার
নামকরণ: ২০১১ সালে বিমা কোম্পানি মেটলাইফ ২৫ বছরের জন্য স্টেডিয়ামটির নামকরণের স্বত্ব লাভ করে। এর আগে এটি ‘নিউ মিডোল্যান্ডস স্টেডিয়াম’ নামে পরিচিত ছিল।

স্বীকৃতি: ২০০৯ সালে ইপিএ একে এনএফএল-এর ‘সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব স্টেডিয়াম’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১৭ সালে এটি ‘ভেন্যু অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার লাভ করে।

যাতায়াত ব্যবস্থা

স্টেডিয়ামটিতে দর্শকরা গাড়ি ছাড়াও মিডোল্যান্ডস রেল লাইন এবং বিভিন্ন বাস সার্ভিসের মাধ্যমে যাতায়াত করতে পারেন। খেলার দিনগুলোতে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস চালু থাকে যা নিউ ইয়র্ক প্যান স্টেশন এবং নেওয়ার্ক প্যান স্টেশনের সাথে সংযোগ রক্ষা করে।

মেটলাইফ: বিশ্বকাপ ২০২৬ সূচি

* সব ম্যাচের সূচি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী।

গ্রুপ পর্ব
১৩ জুন, ব্রাজিল-মরক্কো, রাত ৪টা (১৪ জুন)
১৬ জুন, ফ্রান্স-সেনেগাল, রাত ১টা (১৭ জুন)
২২ জুন, নরওয়ে-সেনেগাল, সকাল ৬টা (২৩ জুন)
২৫ জুন, ইকুয়েডর-জার্মানি, রাত ২টা (২৬ জুন)
২৭ জুন, পানামা-ইংল্যান্ড, রাত ৩টা (২৮ জুন)

নকআউট (শেষ ৩২)
৩০ জুন, ম্যাচ-৬, রাত ৩টা (১ জুলাই)

নকআউট (শেষ ১৬)
৫ জুলাই, ম্যাচ ৩, রাত ২টা (৬ জুলাই)

ফাইনাল
১৯ জুলাই, ফাইনাল, রাত ১টা (২০ জুলাই)

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।